গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৭:২৭ পিএম, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৭:৫৫ এএম ২০২৬
শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
ছবি

ফাইল ছবি

একটি শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সময় কোনো মা-বাবা কি কখনো কল্পনা করেন, সুশিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় যে সন্তানের হাত শিক্ষকের হাতে তুলে দিলেন, সেই সন্তানকেই সেখানে যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হবে? শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে এমন আশঙ্কা সভ্য সমাজের জন্য গভীর লজ্জার এবং উদ্বেগের। গাজীপুরের টঙ্গীতে আবাসিক মাদ্রাসায় ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এবং বিচার চাইতে গিয়ে তার বাবার শিক্ষককে থাপ্পড় দেওয়ার ঘটনা তাই নিছক একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নয়। এটি শিশুর সুরক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, সামাজিক বিবেক ও আইনের শাসন-চারটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, শিশুটির বাবা দাবি করেছেন, ঘটনার বিষয়ে অধ্যক্ষকে আগেই জানিয়েও কার্যকর প্রতিকার পাননি। পরে অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁকে মারধর করা হয়। শিশুটির বাবা বলেছেন, সন্তানের বিচার চাইতেই তিনি মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন, জনতার হামলা সংগঠিত করতে নয়। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে ভাঙচুর, শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধর ও ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ এনেছে। বাবা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সিসিটিভির ফুটেজ যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ শিশুটির জবানবন্দি আদালতে লিপিবদ্ধ করেছে, বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে এবং তদন্তে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষক গ্রেফতার হয়েছেন; পাশাপাশি বাবার বিরুদ্ধেও পৃথক অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

এই তথ্যগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে দৃষ্টি ফেরায়: শিশুর অভিযোগকে কোনোভাবেই তুচ্ছ করা যাবে না; আবার অভিযোগের ভিত্তিতেই কাউকে চূড়ান্ত অপরাধী ঘোষণা করাও চলবে না। একজন পিতার ক্ষোভ ও প্রতিবাদ মানবিকভাবে বোধগম্য; কিন্তু থাপ্পড় কিংবা গণপিটুনি বিচারব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না। একইভাবে, শারীরিক আঘাতের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি শিশুর নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য নিপীড়নের অভিযোগ আড়ালে পড়ে যায়, তবে ন্যায়বিচারের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। অপরাধ প্রমাণের দায়িত্ব আদালতের, আর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের।

সামাজিক মাধ্যমে শিশুটির বাবাকে হুমকি দেওয়া এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট বলে প্রচারের অভিযোগও উদ্বেগজনক। এসব দাবির পক্ষে প্রমাণ ছাড়া অপবাদ ছড়ানো, পরিবারকে ভয়ভীতি দেখানো কিংবা প্রতিশোধের পরিবেশ তৈরি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনমতকে প্রভাবিত করার এমন প্রচেষ্টা তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তবে সামাজিক মাধ্যমে বাবার প্রতি ব্যাপক সহানুভূতি থাকলেও সেটিকে অপরাধের বিচারিক নিষ্পত্তি হিসেবে দেখা যাবে না। জনতার আবেগ নয়, ঘটনার প্রমাণই হবে বিচারের ভিত্তি।

সরকারের এখনই পক্ষপাতহীন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষানীতি, অভিযোগ জানানোর গোপন ও নিরাপদ ব্যবস্থা, শিক্ষক নিয়োগ ও আচরণবিধি, নিয়মিত পরিদর্শন এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত বাধ্যতামূলক করতে হবে। আবাসিক প্রতিষ্ঠানে শিশুদের চলাচলের নিরাপত্তা, তদারকি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ চাপা দেওয়া, ভুক্তভোগীকে ভয় দেখানো কিংবা তদন্তে বাধা দেওয়ার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

ধর্মভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা, সংযম ও মানবিকতার শিক্ষা দেওয়ার কথা। সেই পরিচয়ের আড়ালে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে ধর্মীয় মর্যাদা দিয়ে তাকে আড়াল করার সুযোগ নেই। আবার একটি ঘটনার দায়ে সব মাদ্রাসা বা ধর্মীয় শিক্ষককে অভিযুক্ত করাও অসঙ্গত। প্রয়োজন সত্য উদ্ঘাটন, দায় নির্ধারণ এবং কার্যকর সংস্কার।

একটি শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম বড় হতে পারে না; আবার ন্যায়বিচারের চেয়ে জনরোষও বড় নয়। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে, ক্ষমতা, পরিচয় কিংবা প্রভাবের কাছে শিশুর কান্না অসহায় নয়। নিরপেক্ষ তদন্ত, দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
সানা/আপ্র/২৬/১০/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

প্রবাসীর শিরচ্ছেদ-সাড়ে সাত হাজার বন্দি, রাষ্ট্রের অবস্থান কী?
২৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রবাসীর শিরচ্ছেদ-সাড়ে সাত হাজার বন্দি, রাষ্ট্রের অবস্থান কী?

বিদেশের কারাগারে একজন বাংলাদেশি বন্দি থাকবেন, তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত সাজা কার্যকর হব...

রক্তাক্ত খুলনায় জননিরাপত্তার এমন বিপর্যয় আর কত দিন
২৪ অক্টোবর ২০২৬

রক্তাক্ত খুলনায় জননিরাপত্তার এমন বিপর্যয় আর কত দিন

খুলনা কি ক্রমেই খুন-খারাবির নগরীতে পরিণত হচ্ছে? এক দিনে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গুলি করে যুবক ও গৃহবধূক...

ডিজে পার্টিসহ মাদক ব্যবসায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করুন
২২ অক্টোবর ২০২৬

ডিজে পার্টিসহ মাদক ব্যবসায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করুন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার বাসায় ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক সেবন, মাদক ব্য...

প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক পূজামণ্ডপ সফর: সমানাধিকারের বার্তা
২২ অক্টোবর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক পূজামণ্ডপ সফর: সমানাধিকারের বার্তা

রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার প্রশাসনিক কর্তৃত্বে নয়, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমান অধিকার ন...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 16 ঘন্টা আগে