রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত বেসরকারি মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার পুনর্গঠনে দলীয় তহবিল থেকে ৫০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পরিদর্শন করে তিনি এ ঘোষণা দেন। জামায়াতে ইসলামীর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পরে দলটির প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, ঘোষিত অর্থ জামায়াতের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে।
পরিদর্শন শেষে শফিকুর রহমান বলেন, এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে আরো সহযোগিতা করা হবে। প্রাথমিকভাবে যে সহায়তা ঘোষণা করা হয়েছে, তা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, এটি শুরু, শেষ নয়।
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মিরপুর-১ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে একদল লোক হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। পরে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। হামলাকারীরা ঘটনাস্থলে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লি.’ নামে একটি সাইনবোর্ডও টাঙিয়ে যায়।
স্বাস্থ্যকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, হামলার সময় নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা, আসবাবসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়। পরে সেগুলোর কিছু অংশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, দারুসসালাম থানার বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে ৪৬ ধরনের লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে আসবাব, টিকা, রেজিস্টার খাতা, ফ্রিজ, অফিসের কাগজপত্র, মুদ্রণযন্ত্র ও বিদ্যুৎ উৎপাদনযন্ত্র রয়েছে। মালামাল বহনের কাজে ব্যবহৃত দুটি কাভার্ড ভ্যানও আটক করা হয়েছে।
এ ঘটনায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পক্ষ থেকে শাহ আলী থানায় মামলা করা হয়েছে। তদন্তের পাশাপাশি হামলা ও লুটপাটে জড়িতদের গ্রেফতার এবং বাকি মালামাল উদ্ধারে অভিযান চলছে। এরই মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশের সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেননি এবং পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই লুটপাট চলার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগের কথা এসেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, ঘটনার সঙ্গে কারো সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলেই তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শফিকুর রহমান স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া এত বড় অপকর্ম করার সাহস কেউ করবে না। অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথাও উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। তাঁর অভিযোগ, সরকারি দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দেশজুড়ে গণপিটুনি ও জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের ঘটনা যাতে আর কোথাও না ঘটে, সে জন্য সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানান শফিকুর রহমান।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি মিরপুরের নিম্ন আয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। শিশুদের টিকাদান, শিশুস্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হতো সেখানে। স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরও কর্মীরা ধ্বংসস্তূপের সামনে বসে সীমিত পরিসরে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। দ্বিতীয় দিনেও সেখানে নারী ও শিশুদের চিকিৎসা ও টিকাদান কার্যক্রম চালানো হয়।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পরিদর্শন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সরকারি প্রতিনিধিও দ্রুত সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
পরিদর্শনকালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মুহাম্মদ রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহফুজুর রহমানসহ দলটির নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/২৮/৯/২০২৬