উঠতি বয়স এমন একটি সময়- যখন সন্তান ধীরে ধীরে পরিবার থেকে নিজের আলাদা একটি জগৎ তৈরি করতে শুরু করে। এই সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, গল্প, খেলাধুলা কিংবা অনলাইনে যোগাযোগের সবকিছুর গুরুত্ব বাড়ে। মা-বাবার কথা যেখানে অনেক সময় ‘উপদেশ’ বলে মনে হতে পারে, সেখানে বন্ধুর একটি কথাই সন্তানের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। এটি বয়ঃসন্ধির স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশের অংশ।
উঠতি বয়সে কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের পরিচয়, মূল্যবোধ ও সামাজিক অবস্থান গড়ে তুলতে সমবয়সিদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখে। তাই এ সময়ে সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, সেটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে তাকে সুস্থ ও অসুস্থ বন্ধুত্বের পার্থক্য নিজেই বুঝতে শেখানো বেশি জরুরি। তা হলো-
আগে সেটিই বোঝাতে হবে ভালো বন্ধু কেমন: সন্তানকে শুরুতেই বলুন, ভালো বন্ধু মানেই সব সময় একই মতের মানুষ নয়। বরং ভালো বন্ধু এমন একজন, যার সঙ্গে নিজের কথা বলা যায়, মতের অমিল হলেও সম্মান বজায় থাকে এবং নিজের মতো থাকার সুযোগ থাকে। যে বন্ধু আপনার সন্তানকে উৎসাহ দেয়, ভুল করলে অপমান না করে বুঝিয়ে বলে, তার ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সম্মান করে এবং সমস্যার সময় পাশে থাকে- এগুলো সুস্থ বন্ধুত্বের লক্ষণ। একইভাবে একজন ভালো বন্ধুর নিজেরও আলাদা পছন্দ, আগ্রহ ও অন্য বন্ধু থাকতে পারে। শিশু-কিশোরদের সম্পর্ক নিয়ে আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসও পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা, সদয় আচরণ, মতবিরোধ নিয়ে খোলামেলা কথা বলা এবং ভুল হলে ক্ষমা চাওয়াকে স্বাস্থ্যকর বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ক্ষতিকর আচরণ চিনতে শেখানো: কোনো বন্ধুকে সরাসরি ‘খারাপ’ বলে দিলে সন্তান অনেক সময় উল্টো সেই বন্ধুর পক্ষ নিতে পারে। বিশেষ করে কৈশোরে নিজের পছন্দ ও স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হয়েছে মনে হলে সে মা-বাবার কাছ থেকে আরও দূরে সরে যেতে পারে।
যে বন্ধু সবকিছুতে চাপ দেয়: বন্ধুত্বের নামে চাপ দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। ‘এটা না করলে তুমি আমার বন্ধু নও’; ‘সবাই করছে, তুমিও করো’; ‘বাড়িতে বলবে না’-এ ধরনের কথা শুনলে সন্তান যেন বুঝতে পারে- এটি বন্ধুত্বের স্বাভাবিক অংশ নয়। উঠতি বয়সে সমবয়সিদের প্রভাব বিশেষভাবে শক্তিশালী হতে পারে। কিশোররা কখনো কখনো দলের মতামতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিজের মতামতও বদলে ফেলতে পারে। তাই সন্তানকে ছোট ছোট বাক্যে ‘না’ বলতে শেখান- ‘আমি এটা করতে চাই না’, ‘এটা আমার ভালো লাগছে না’, ‘তুমি করলেও আমি করব না।’
অপমান, ভয় দেখানো বা গোপনীয়তার চাপ: বন্ধু যদি নিয়মিত শরীর, পোশাক, পরিবার, পড়াশোনা বা চেহারা নিয়ে অপমান করে; সবার সামনে ছোট করে; ভয় দেখায় কিংবা ব্যক্তিগত ছবি বা কথা গোপন রাখার নামে চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে সেটিকে স্বাভাবিক বন্ধুত্ব হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত নয়; বিশেষ করে অনলাইন বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও সন্তানকে বোঝাতে হবে- বন্ধু হলেও কেউ ব্যক্তিগত ছবি, পাসওয়ার্ড বা এমন কোনো তথ্য চাইতে পারে না- যা শেয়ার করলে সে অস্বস্তিতে পড়ে।
ছেলে ও মেয়ের ক্ষেত্রেই একই নিয়ম: অনেক পরিবারে ছেলেদের বন্ধুত্বে ‘দুষ্টুমি’ বলে কিছু আচরণ এড়িয়ে যাওয়া হয়, আবার মেয়েদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করা হয়। দুটির কোনোটিই কার্যকর নয়। ছেলে হোক বা মেয়ে-বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে সম্মান, নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সীমারেখা ও নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে বোঝাতে পারেন- ‘বন্ধু ছেলে না মেয়ে, সেটি মূল বিষয় নয়; সে তোমার সঙ্গে কেমন আচরণ করছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।’
নিষেধ করার আগে শোনা: সন্তান যদি কোনো বন্ধুর কথা বলে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য করবেন না- ‘ওকে আমার ভালো লাগে না’ কিংবা ‘ওর সঙ্গে আর মিশবে না’; বরং মন দিয়ে শুনুন। কিশোরের কথা শেষ করার সুযোগ দিন। কিশোরদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে শিশু-কিশোর বিশেষজ্ঞরা বিচার না করে শোনা, অতিরিক্ত ভয় দেখানো বা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে না তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
সন্তানের বন্ধুদের জানা: সন্তানের বন্ধু কারা, তারা কী পছন্দ করে, কোথায় সময় কাটায়- এসব সম্পর্কে মা-বাবার মোটামুটি ধারণা থাকা ভালো। বন্ধুদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানানো, একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করা কিংবা বন্ধুদের অভিভাবকদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যেতে পারে। এতে সন্তানও বুঝবে, তার সামাজিক জগৎকে মা-বাবা অস্বীকার করছেন না। সূত্র: সাইকোলজি টুডে।
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬