জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকির অভিযোগে প্রায় চার বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ সরকারি ডিভাইসে নিষিদ্ধ থাকা টিকটক ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে মার্কিন সরকারি কর্মকর্তারা আবারও সরকারি ডিভাইসে ভিডিওভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটির অ্যাপ ব্যবহার করতে পারবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা ও বাজেট কার্যালয়ের নতুন এক স্মারকের মাধ্যমে ২০২২ সালে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে টিকটককে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, মালিকানা পরিবর্তন এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিতর্ক নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করল।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম এনগ্যাজেট জানিয়েছে, টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানা কাঠামো ও সুপারিশ অ্যালগরিদমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন সরকারি ডিভাইসে অ্যাপটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ব্যবস্থাপনা ও বাজেট কার্যালয়ের স্মারকে মার্কিন বিচার বিভাগের সাম্প্রতিক একটি পর্যবেক্ষণের উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাইটড্যান্সের অধীনে পরিচালিত আগের টিকটকের সঙ্গে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত টিকটকের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
স্মারকে সরাসরি বলা হয়েছে, সরকারি ডিভাইসে টিকটক ব্যবহার করা যেতে পারে।
নিরাপত্তা-উদ্বেগ থেকে নিষেধাজ্ঞা: চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের মালিকানাধীন টিকটককে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ ছিল। চীনা সরকারের সম্ভাব্য প্রভাব, ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ এবং অ্যাপটির সুপারিশ অ্যালগরিদমের মাধ্যমে তথ্য ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
২০২২ সালে জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকাংশ সরকারি ডিভাইসে টিকটক নিষিদ্ধ করা হয়। তৎকালীন বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি এফবিআইয়ের তৎকালীন পরিচালক ক্রিস্টোফার রেইও টিকটককে জাতীয় নিরাপত্তার সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা টিকটকের মাধ্যমে ঠিক কী ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত তথ্য দেননি। বরং ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, তথ্যের সম্ভাব্য ব্যবহার এবং চীনা সরকারের প্রভাবের আশঙ্কাই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল।
এরপর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের স্বাক্ষর করা আইনের মাধ্যমে বাইটড্যান্সকে টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা কোনো মার্কিন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করার অথবা দেশটিতে অ্যাপটির কার্যক্রম বন্ধ করার পথ বেছে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
মালিকানা বদলের পর বদলে গেল অবস্থান: এই আইনি জটিলতার কারণে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে যায়। পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অ্যাপটি আবার সচল হয়।
চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের টিকটক ব্যবসাকে মূল কোম্পানি থেকে আলাদা করার চুক্তিও চূড়ান্ত হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের টিকটক পরিচালনা করছে ‘টিকটক ইউএসডিএস জয়েন্ট ভেঞ্চার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর অর্থায়নে রয়েছে ওরাকল, সিলভার লেইকসহ কয়েকটি শীর্ষ মার্কিন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান।
তবে বাইটড্যান্সের সম্পৃক্ততা পুরোপুরি শেষ হয়নি। নতুন মার্কিন সত্তাটির ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ মালিকানা এখনো বাইটড্যান্সের হাতে রয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের নতুন সিদ্ধান্তের পেছনে এই পরিবর্তিত মালিকানা কাঠামো এবং অ্যাপটির প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সরকারই এবার টিকটকে সক্রিয়: মজার বিষয় হলো, সরকারি ডিভাইসে টিকটক ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান প্ল্যাটফর্মটিতে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে শুরু করেছে।
বিচার বিভাগের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর দেশটির কয়েকটি কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা তাদের সরকারি অ্যাকাউন্ট থেকে টিকটকে বিভিন্ন কনটেন্ট প্রকাশ শুরু করেছে। গত মাসে পরিবহন বিভাগ, অর্থ বিভাগ এবং স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ নতুন টিকটক অ্যাকাউন্ট চালু করেছে।
এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয় হোয়াইট হাউসও চলতি বছর তাদের আনুষ্ঠানিক টিকটক অ্যাকাউন্ট চালু করেছে।
ফলে যে অ্যাপকে একসময় জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনা করে সরকারি ডিভাইস থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর পরিবর্তনের পর সেই টিকটকই এখন মার্কিন সরকারের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠছে।
সানা/আপ্র/১৪/৮/২০২৬