দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে ছয় মাসের চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও নেপালি কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা শের বাহাদুর দেউবা। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাকে ঘিরে সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। অভিযোগ অস্বীকার করে আসা ৮০ বছর বয়সী এই রাজনীতিককে এখন দেশটির চলমান তদন্তের মুখোমুখি হতে হবে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় দেউবা রাস্তার পাশে জড়ো হওয়া শত শত সমর্থকের উদ্দেশে হাত নাড়েন এবং তাদের অভ্যর্থনা গ্রহণ করেন।
দেউবার দেশে ফেরার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন নেপালের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন চলছে। তরুণদের নেতৃত্বে গত বছরের সেপ্টেম্বরের ব্যাপক বিক্ষোভের পর ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। দুর্নীতি, রাজনৈতিক অনিয়ম, অর্থনৈতিক সংকট এবং দীর্ঘদিনের শাসকগোষ্ঠীর প্রতি জনঅসন্তোষ ওই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।
এরপর ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের সরকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা জোরদার করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় গত এপ্রিলে অর্থ পাচারের অভিযোগে দেউবার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তার স্ত্রী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবার বিরুদ্ধেও একই ধরনের পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
দেউবা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়েন। দীর্ঘ ছয় মাস বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার পর বৃহস্পতিবার তিনি নেপালে ফিরলেন। শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন তিনি।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র অবি নারায়ণ কাফলে জানিয়েছেন, দেউবার বিষয়টি অর্থ পাচার তদন্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় তাকে বিমানবন্দর থেকে নিরাপদে বের করে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দেউবার প্রত্যাবর্তনের পেছনে রয়েছে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। গত বছরের সেপ্টেম্বরের তরুণদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত নেপালের তৎকালীন সরকারের পতন ঘটায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভের সূচনা হলেও দ্রুত তা দুর্নীতি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভে রূপ নেয়।
বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ও সরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেয়। দেউবার বাড়িও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। তার বাড়িতে হামলার বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশটির রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ ওঠে, অগ্নিকাণ্ডের পর দেউবার বাড়ি ও অন্যান্য সম্পত্তি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও অর্থ উদ্ধারের নানা দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেগুলোকে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন দেউবা। তদন্ত কমিশনের কাছে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি ভিডিওগুলোকে ভুয়া বা সাজানো বলেও দাবি করেন।
তবে বিষয়টি সেখানেই থেমে থাকেনি। দেউবার বাড়ি ও অন্যান্য সম্পত্তি থেকে কথিত নগদ অর্থ উদ্ধারের বিষয়টি আরও গভীরভাবে তদন্ত করার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিশন।
এর মধ্যেই নেপালি কংগ্রেসের ভেতরেও নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়েছে। দলের তরুণ নেতাদের চাপের মুখে গত জানুয়ারিতে সভাপতি হিসেবে দেউবার মেয়াদ শেষ হয়। ফলে একদিকে আইনি তদন্ত, অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের পরিবর্তন—দুই দিক থেকেই কঠিন সময়ের মুখে পড়েছেন নেপালের এই দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী রাজনীতিক।
দেউবার দেশে ফেরাকে তাই শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছে না নেপালের রাজনৈতিক মহল। এটি একই সঙ্গে **ক্ষমতাবান রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জবাবদিহি, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে তরুণ প্রজন্মের উত্থানের পরিণতি** হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নেপালের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা দেউবার জন্য এবার অপেক্ষা করছে ভিন্ন এক পরীক্ষা—ক্ষমতার আসন নয়, বরং অভিযোগের জবাব দেওয়ার কঠিন মঞ্চ।
সানা/আপ্র/১৪/৮/২০২৬