বাংলাদেশে ঘুম ঘুম চোখে সকালে যারা টিভি পর্দায় চোখ রেখেছেন, অনেকেই হয়তো চোখ কচলে তাকিয়েছেন। বিভ্রমে পড়েছেন নিশ্চয়ই অনেকেই, এটা স্বপ্ন নাকি বাস্তব! সময় যত গড়িয়েছে, সেই আনন্দময় বিস্ময় ক্রমে বেড়েছে।
দিন শেষের চিত্রটুকু ফুটিয়ে তুলতে সেই পুরোনো কথাটিরই আশ্রয় নিতে হচ্ছে, বাস্তব কখনও কখনও কল্পনার চেয়েও সুন্দর! অনেক শঙ্কা, ভয়, দুর্ভাবনাকে সঙ্গী করে শুরু হয়েছিল যে ম্যাচ, সেটির শুরুতেই মিলেছে অভাবনীয় প্রাপ্তি। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়াতে টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম দিনটি দাপুটে পারফরম্যান্সে রাঙিয়েছে বাংলাদেশ।
ডারউইন টেস্টের প্রথম দিনে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শেষ হয়েছে ১৯৮ রানে। বাংলাদেশ দিন শেষ করেছে ১ উইকেটে ৯৬ রান নিয়ে। অনায়াসেই বলে দেওয়া যায়, বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সেরা দিনগুলির একটি! এই দিনটি রচিত হয়েছে হাসান মাহমুদের বোলিং শিল্পের ছোঁয়া।
নিখুঁত লাইন-লেংথ আর ছোট ছোট সুইং ও মুভমেন্টে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের নাস্তানাবুদ করে ক্যারিয়ার সেরা পারফরম্যান্সে তার প্রাপ্তি ৫৫ রানে ৬ উইকেট।
টেস্টে তো বটেই, তিন সংস্করণ মিলিয়েই অস্ট্রেলিয়াতে পাঁচ উইকেটের স্বাদ পাওয়া বাংলাদেশের প্রথম বোলার তিনি। ২৬ বছর বয়সী পেসার তৃতীয়বার পেলেন টেস্ট ইনিংসে পাঁচ উইকেট।
এর আগে পেয়েছিলেন ভারত ও পাকিস্তানে। উজ্জ্বল ছিলেন পেস আক্রমণে হাসানের দুই সহযোদ্ধাও। প্রথম স্পেলে একটু এলোমেলো থাকলেও পরে পুষিয়ে দিয়ে দুটি উইকেট নিয়েছেন তাসকিন আহমেদ।
নাহিদ রানাকে না পাওয়ার হাহাকার অনেকটাই পুষিয়ে দিয়ে ইবাদত হোসেন চৌধুরিও নিয়েছেন দুটি উইকেট। ইবাদতের কথা বলতে হবে একটু আলাদা করেই। এই সফরে তার থাকার কথাই ছিল না। সম্ভানসম্ভবা স্ত্রীর সঙ্গে তিনি ছুটিতে ছিলেন ইতালিতে। নাহিদ, শরিফুল ইসলামদের চোটে তার জরুরি তলব পড়ল।
সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ডারউইনে তিনি দারুণভাবে মেলে ধরলেন নিজেকে। স্রেফ দুটি উইকেট তার বোলিংয়ে ফুটিয়ে তুলতে পারবে না। এসিএলের অস্ত্রোপচারের আগে যেমন ছিলেন, অনেক দিন পর সেই আগুনে রূপে দেখা গেছে তাকে। ৭১ রান করে অস্ট্রেলিয়াকে মহাবিপদ থেকে কিছুটা উদ্ধার করেছেন স্টিভেন স্মিথ।
তিনি ২ রানে জীবন না পেলে ইনিংসের চিত্র কেমন হতো, কে জানে! মারারা স্টেডিয়ামের উইকেট সবুজ ঘাসে ভরা।
টস জিতে তবু ব্যাটিং নেন প্যাট কামিন্স। সবুজ উইকেটে ম্যাচের শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনারদের পরীক্ষা নেন হাসান। তাসকিনের বোলিং ছিল ভালো-মন্দের মিশেল। দুই ব্যাটসম্যানই অল্পের জন্য রক্ষা পান কয়েক দফায়। প্রথম ১০ ওভার পার করেন ট্রাভিস হেড ও জেইক ওয়েদেরল্ড।
ম্যাচের দ্বিতীয় বলে বাউন্ডারি দিয়ে শুরু করলেও বিপজ্জনক হেডকে হাত খুলতে দেননি বোলাররা। ১০ ওভার শেষে তার রান ছিল ৩১ বলে ১০। টেকনিক ও স্টান্সে একটু পরিবর্তন আনা ওয়েদরল্ড ছিলেন তুলনামূলক অগ্রণী। আউটও হন তিনিই আগে। হাসানের বেশ বাইরের বল তাড়া করে ধরা পড়েন কিপারে কাছে।
উদ্বোধনী জুটি থামে ৪৫ রানে। হাসানের পরের ওভারে বিদায় নেন হেডও। বাউন্ডারি হজমের পর অ্যাঙ্গল বদলে রাউন্ড উইকেটে করা ডেলিভারিটি স্টাম্পে টেনে আনেন আগ্রাসী ব্যাটার।
৭ ওভারের টানা স্পেলে অস্ট্রেলিয়ানদের ভুগিয়ে একটু বিরতি নেন হাসান। তখন তাদেরকে চেপে ধরেন ইবাদত। তার বলে স্লিপে স্মিথের সহজ ক্যাচ ছাড়েন তানজিদ হাসান। উইকেটের দেখা পেয়ে যান তিনি অন্য প্রান্তে। বিদায় করে দেন ধুঁকতে থাকা মার্নাস লাবুশেনকে।
দলে জায়গা বাঁচানোর লড়াইয়ে থাকা অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান ২০ বল খেলে করতে পারেন স্রেফ ১। ফিফটি নেই তার আট ইনিংস ধরে, সবশেষ সেঞ্চুরি ছিল ৪১ ইনিংস আগে। দলে জায়গা নিয়ে দুর্ভাবনায় থাকা আরেকজন ক্যামেরন গ্রিন ক্রিজে যাওয়ার পরপর তাসকিনকে ছক্কা মারেন পুল করে। ওই ওভারেই তাকে বিদায় করে শোধ তোলেন অভিজ্ঞ পেসার। চার উইকেট নিয়ে লাঞ্চে যায় বাংলাদেশ।
গোটা দিনে অস্ট্রেলিয়ার সেরা সময়টা আসে লাঞ্চের পর প্রথম ঘণ্টায়। বেশ দাপটে ব্যাট করতে থাকেন স্মিথ ও অ্যালেক্স কেয়ারি। ইনিংসের একমাত্র অর্ধশত রানের জুটি গড়েন তারা।
স্মিথের ফিফটি আসে ৭৬ বলে। তবে পরের ঘণ্টায় দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। পানি পানের বিরতির পর প্রথম বলেই কেয়ারিকে বোল্ড করে ৫৫ রানের জুটি ভাঙেন ইবাদত।
দিনের সেরা ডেলিভারিটিতে বাউ ওয়েবস্টারের অফ স্টাম্পে ছোবল দেন তাসকিন। ইনিংসের বাকিটুকু শুধু হাসানের গল্প। চা বিরতির আগে ফেরান তিনি অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক কামিন্সকে।
বিরতির পর দারুণ ডেলিভারিতে বিদায় করেন গত অ্যাশেজে লোয়ার অর্ডারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা মিচেল স্টার্ককে। পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন তিনি সবচেয়ে বড় উইকেটটি নিয়ে। ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে বড় শটের চেষ্টা করেন স্মিথ।
সেটি বুঝতে পেরেই লেংথ টেনে দেন হাসান। সহজ ক্যাচটি নেন লিটন। এরপর শেষ উইকেটটি নিতেও সময় খুব বেশি লাগেনি তার। বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথমবার দুশর নিচে থামে অস্ট্রেলিয়া।
উইকেট তখনও ছিল যথেষ্ট প্রাণবন্ত। অস্ট্রেলিয়ার ভয়ঙ্কর পেসত্রয়ীর সামনে বাংলাদেশের ভঙ্গুর টপ অর্ডার নিয়ে তাই ভয়ের জায়গা ছিল প্রবলভাবেই। দ্বিতীয় ওভারে জশ হেইজেলউডকে তুলে মারার চেষ্টায় ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান তানজিদ হাসান।
এরপর তানজিদ ও সাদমান ইসলাম শুধু শুরুর সময়টা নিরাপদেই কাটাননি, ৮ ওভারে রান তুলে ফেলেন ৩৫।
তাতে উড়ে যায় শুরুর স্নায়ুর চাপ। মুহূর্তের অমনোযোগে উইকেট হারান ২০ রান করা সাদমান। ওই উইকেট নিয়ে রাঙ্গানা হেরাথকে (৪৩৩) ছাড়িয়ে টেস্ট ইতিহাসের সফলতম বাঁহাতি বোলার হয়ে যান মিচেল স্টার্ক (৪৩৪)।
তানজিদ ও মুমিনুল এরপর ভুল আর করেননি বললেই চলে। ছাড়ার বল ছেড়েছেন, মারার বল মেরেছেন। তাতে বেড়েছে রান গড়ে উঠেছে জুটি। টেস্ট ইতিহাসের সফলতম চতুষ্টয় স্টার্ক-হেইজেলউড-কামিন্স-লায়নের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে তাদের সামনে।
দুজনই ক্রিজের গভীরে গিয়ে, নরম হাতে খেলেছেন, বলের জন্য অপেক্ষা করেছেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামা তানজিদ দিন শেষে অপরাজিত ৬৭ বলে ৩২ রানে। মুমিনুল দিন শেষ করেন ৪৯ বলে ৩৫ রানে। এই ইনিংসের পথে তামিম ইকবালকে (৫১৩৪) ছাড়িয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সফলতম টেস্ট ব্যাটসম্যানও এখন তিনি।
দিনের শেষ বলটি হওয়ার পর ধারাভাষ্যে ডেভিড ওয়ার্নার বললেন, ‘বাংলাদেশের দিন, ওয়েল অ্যান্ড ট্রুলিৃ মাথা উঁচু রাখতে পারে তারা।” উইকেট ও রানের সঙ্গে এই সম্মানও প্রথম দিনে বাংলাদেশের বড় প্রাপ্তি!
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ৫৩ ওভারে ১৯৮ (হেড ২২, ওয়েদেরল্ড ২৩, লাবুশেন ১, স্মিথ ৭১, গ্রিন ১৩, কেয়ারি ১৯, ওয়েবস্টার ১২, কামিন্স ৯, স্টার্ক ১, লায়ন ৭, হেইজেলউড ৪*; তাসকিন ১৬-২-৫৫-২, মাহমুদ ১৭-৩-৫৫-৬, ইবাদত ১১-২-৩৯-২, মিরাজ ৪-০-১২-০, তাইজুল ৫-০-২৪-০)
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ২৪ ওভারে ৯৬/১ (সাদমান ২০, তানজিদ ৩২*, মুমিনুল ৩৫*; স্টার্ক ৭-১-২৮-১, হেইজলেউড ৭-২-১৯-০, গ্রিন ৩-১-১২-০, কামিন্স ৪-০-১৪-০, লায়ান ৩-০-১৬-০)
ডিসি/আপ্র/১৩/০৮/২০২৬