সাঈদ বারী
বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, ভাষার অধিকার, স্বাধীনতার স্বপ্ন কিংবা গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়; তাহলে তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। ১৯২১ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠ কেবল উচ্চশিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠান নয়; আমাদের আত্মপরিচয় নির্মাণের এক ঐতিহাসিক ভিত্তি। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় নেতৃত্ব বিকাশে অনন্য অবদান রাখায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত মর্যাদা লাভ করেছে। তাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্মদিন নয়; জাতির আত্মপর্যালোচনা, কৃতজ্ঞতা এবং নতুন প্রত্যয়েরও দিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজন থেকে। ঔপনিবেশিক শাসনামলে পূর্ববঙ্গ উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন বৈষম্যের শিকার ছিল। সেই বঞ্চনা দূর করার দাবি থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় এ বিশ্ববিদ্যালয়। অল্প কয়েকটি অনুষদ, সীমিতসংখ্যক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই এটি জ্ঞানচর্চা ও মুক্তবুদ্ধির অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদান বা সনদ প্রদানের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং এমন নাগরিক গড়ে তোলার প্রয়াস নিয়েছে- যারা যুক্তিবাদী, মানবিক, দায়িত্বশীল এবং সমাজসচেতন। মুক্তচিন্তা, সহিষ্ণুতা, বিতর্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার যে পরিবেশ এই ক্যাম্পাসে গড়ে উঠেছিল, সেটিই পরবর্তীকালে জাতীয় জীবনের নানা আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করে।
বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল অনন্য। ভাষা আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রসমাজের প্রধান সংগঠক শক্তি ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। সেই আন্দোলন কেবল ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেনি; আমাদের জাতীয় চেতনারও ভিত্তি নির্মাণ করেছিল।
ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ- প্রতিটি পর্বেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল স্বাধীনতার সংগ্রামের অন্যতম কেন্দ্র। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর গণহত্যার অন্যতম লক্ষ্য ছিল এই ক্যাম্পাস। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে আরও গৌরবান্বিত করেছে। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একই স্রোতে প্রবাহিত।
স্বাধীনতার পরও দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ঐতিহাসিক ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের ঐক্য, সাহস ও আত্মত্যাগ ওই আন্দোলানকে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। একইভাবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বৈষম্য, নিপীড়ন ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রশ্নে সোচ্চার হয়ে দেশব্যাপী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তাদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে জাতীয় পরিসরে বিস্তৃত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তরুণ সমাজের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটায়।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এ দুটি আন্দোলন প্রমাণ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়; দেশের সংকটময় সময়ে ন্যায়, অধিকার ও জন-আকাক্সক্ষার পক্ষে সোচ্চার এক প্রাণকেন্দ্রও বটে। অসংখ্য রাষ্ট্রনায়ক, বিচারপতি, প্রশাসক, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কূটনীতিক ও সংস্কৃতিসেবীর শিক্ষাজীবনের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারণ, সাহিত্য-সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব- সবক্ষেত্রেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অবদান উজ্জ্বল।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চা, নাটক, সংগীত, চারুকলা, বিতর্ক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিকাশেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। টিএসসি, কার্জন হল, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, অপরাজেয় বাংলা, রাজু ভাস্কর্য কিংবা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনÑ এসব কেবল স্থাপনা নয়; এগুলো বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক।
সীমিত সম্পদ নিয়েও ঢাবির শিক্ষক ও গবেষকরা জ্ঞান সৃষ্টির নতুন দিগন্ত উন্মোচনে কাজ করে চলেছেন। তবে বৈশ্বিক বাস্তবতায় গবেষণার পরিধি ও মান আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তা আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ববিদ্যালয় আর কেবল পাঠদাননির্ভর প্রতিষ্ঠান নয়; এটি উদ্ভাবন, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি। ফলে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা অবকাঠামো, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক পরীক্ষাগার, আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মেধাবী গবেষকদের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে শিক্ষাক্রমকে আরও যুগোপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর করে শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করাও অপরিহার্য।
বিশ্ব দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, বায়োটেকনোলজি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, রোবটিকস ও জলবায়ু গবেষণার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা ও উদ্ভাবনের নতুন ক্ষেত্রগুলোতে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। কারণ একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎকর্ষ আজ মূলত নির্ধারিত হয় তার জ্ঞান সৃষ্টি, উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং সমাজে বাস্তব অবদান রাখার ক্ষমতার মাধ্যমে। তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তার উদার বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ, যুক্তিনির্ভর আলোচনা এবং মানবিক মূল্যবোধÑ এসবই একটি মহান বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য কেবল তার অবকাঠামো, ভবনের উচ্চতা কিংবা আন্তর্জাতিক র্যাংকিং দিয়ে নির্ধারিত হয় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান কতটা সৎ, মানবিক, দক্ষ, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তুলতে পারছে তার ওপর। সেই বিচারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে জাতির অন্যতম প্রধান আস্থার প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ যখন জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবননির্ভর উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে চায়, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। উচ্চশিক্ষাকে গবেষণামুখী করা, শিল্প ও শিক্ষার কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলা, নতুন প্রযুক্তির বিকাশে নেতৃত্ব দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অগ্রযাত্রায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। তাই ১ জুলাই কেবল উৎসবের দিন নয়; আত্মমূল্যায়ন ও নতুন অঙ্গীকারেরও দিন।
অতীতের গৌরব আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে। কিন্তু ওই গৌরবকে ধারণ করেই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে হবে। যে বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের প্রেরণা দিয়েছে, স্বাধীনতার সংগ্রামে আত্মত্যাগ করেছে, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদকে হটিয়েছে এবং জাতির নেতৃত্ব গড়ে তুলেছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি।
প্রত্যাশা করি, প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত এই বিদ্যাপীঠ আগামী দিনেও জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মানবতা ও প্রগতির আলোকবর্তিকা হয়ে জাতিকে পথ দেখাবে। অতীতের গৌরব তার শক্তি, আর ভবিষ্যতের উদ্ভাবন ও মানবিক নেতৃত্ব হোক তার নতুন পরিচয়।
লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
আপ্র/কেএমএএ/০২.০৭.২০২৬