গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬

মেনু

ঘাটতির ভারে বাজেট, স্বস্তির প্রতীক্ষায় জনতা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০০:৩৬ পিএম, ০৩ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৮:৫৫ এএম ২০২৬
ঘাটতির ভারে বাজেট, স্বস্তির প্রতীক্ষায় জনতা
ছবি

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন -ফাইল ছবি

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যে বাজেট পাস হয়েছে, তা কেবল একটি আর্থিক দলিল নয়; বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি কঠিন প্রতিচ্ছবি। প্রায় নয় লাখ আটত্রিশ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট আকারে বড় হলেও এর অন্তর্নিহিত ঘাটতি ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ জনজীবনে কাঙিক্ষত স্বস্তি এনে দিতে পারবে কি না-তা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

প্রায় দুই লাখ তেতাল্লিশ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি অর্থনীতির ওপর গভীর চাপ তৈরি করছে। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। ফলে বাজেট যতই বড় হোক, বাস্তব অর্থনৈতিক গতি যদি না বাড়ে, তাহলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।

তবুও এই বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল, এবং কিছু খাতে কর ও ভ্যাট কাঠামোতে সংস্কার-এসব পদক্ষেপ কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার একটি ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি একটি মানবিক অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় সংকট এখনো মূল্যস্ফীতি। বাজেটে সেটিকে নিয়ন্ত্রণের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নই হবে সরকারের প্রকৃত সক্ষমতার পরীক্ষা। বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে না এলে কর ছাড় বা বরাদ্দ বৃদ্ধির সুফল জনসাধারণের কাছে পৌঁছাবে না। তাই শুধু নীতিনির্ধারণ নয়, কঠোর বাজার তদারকি, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।

এই প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারকদের জন্য কিছু জরুরি করণীয় স্পষ্টভাবে সামনে আসে।

প্রথমত, বাজেট বাস্তবায়নে প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শুধু বরাদ্দ ঘোষণা নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়ন ব্যয়ের অপচয় ও অনিয়ম কমানো ছাড়া কাঙিক্ষত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।

দ্বিতীয়ত, রাজস্ব আহরণের ভিত্তি সম্প্রসারণ জরুরি। বর্তমান উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা ছাড়া বিকল্প নেই। পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে, যাতে করের বোঝা ন্যায্যভাবে বণ্টিত হয়।

তৃতীয়ত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে। কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়, শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সামাজিক স্থিতিশীলতা আনতে পারবে না।

চতুর্থত, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ ঋণ বিতরণ এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা না গেলে বিনিয়োগের গতি থেমে যাবে।

পঞ্চমত, দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরি করতে হবে, যাতে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা কমে আসে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এই বাজেট কাগজে-কলমে একটি বড় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হলেও বাস্তবে এটি একটি কঠিন পরীক্ষার নাম। এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ওপর।

জনগণের প্রত্যাশা খুব সরল-নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় হওয়া, আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হওয়া এবং একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ পাওয়া। এই প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে বাজেটের বড় অঙ্ক কেবল পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

অতএব এখন প্রয়োজন ঘোষণা নয়, কার্যকর বাস্তবায়ন। বাজেটের প্রকৃত মূল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন তা সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান স্বস্তি, আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে।
সানা/আপ্র/৩/৭/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

গোলাপি বাসে নিরাপদ চলাচলের নতুন প্রত্যাশা
২০ আগস্ট ২০২৬

গোলাপি বাসে নিরাপদ চলাচলের নতুন প্রত্যাশা

নারীর নিরাপদ, স্বচ্ছন্দ ও মর্যাদাপূর্ণ চলাচল নিশ্চিত করা কেবল পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নের প্রশ্ন নয়; এট...

সরকারের ছয় মাসের হিসাব, জনগণের প্রত্যাশার কঠিন আয়না
১৯ আগস্ট ২০২৬

সরকারের ছয় মাসের হিসাব, জনগণের প্রত্যাশার কঠিন আয়না

একটি নির্বাচিত সরকারের প্রথম ছয় মাস চূড়ান্ত সাফল্য-ব্যর্থতার মাপকাঠি নয়; তবে রাষ্ট্র পরিচালনার গতিপথ...

অস্ট্রেলিয়া জয় শুধু জয় নয়, নতুন বাংলাদেশের বার্তা
১৮ আগস্ট ২০২৬

অস্ট্রেলিয়া জয় শুধু জয় নয়, নতুন বাংলাদেশের বার্তা

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারানো-শুধু একটি টেস্ট জয় নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের আত...

চিকিৎসা ও শিক্ষককল্যাণে রাষ্ট্রের মানবিক অঙ্গীকার
১৭ আগস্ট ২০২৬

চিকিৎসা ও শিক্ষককল্যাণে রাষ্ট্রের মানবিক অঙ্গীকার

রাষ্ট্রের সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু উন্নত অবকাঠামো নির্মাণে নয়; মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, সহজ, মর...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্ট ৬৬ শতাংশ, সরকারের প্রতি ৫৪ শতাংশ

সরকারের ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে পরিচালিত এক জনমত জরিপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দায়িত্ব পালনে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, প্রধানমন্ত্রী ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন ৫৪ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ। সরকারের কর্মকাণ্ডকে খারাপ বলেছেন ৩২ দশমিক ৯০ শতাংশ। ডপলার অপিনিয়ন রিসার্চের ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং সার্ভে ২০২৬’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন এই জরিপে সরকারের সঠিক মূল্যায়ন হয়েছে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 8 ঘন্টা আগে