বিশ্বকাপ শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়; এটি আবেগ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্বপ্নের এক বৈশ্বিক উৎসব। এই উৎসবের কিছু স্থায়ী প্রতীক রয়েছে, যাদের উপস্থিতি বিশ্বকাপকে আরো বর্ণিল, আরো আকর্ষণীয় করে তোলে। ব্রাজিল তেমনই একটি নাম। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী ভারতের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে ফুটবলের আবেগ যেন দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ-ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। তাই শেষ ষোলো থেকেই ব্রাজিলের বিদায় কোটি কোটি সমর্থকের হৃদয়ে গভীর বেদনার জন্ম দিয়েছে। বাস্তবতা হলো, এই দুই দলের একটি আগেভাগে বিদায় নিলে বিশ্বকাপের আবেগও অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই বেদনাও ফুটবলের চিরন্তন সৌন্দর্যকে মুছে দিতে পারে না।
নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের পরাজয় ছিল হতাশাজনক, তবে অপ্রাপ্য নয়। ম্যাচজুড়ে ব্রাজিল সুযোগ সৃষ্টি করেছে, আক্রমণ করেছে, কিন্তু সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। পেনাল্টি নষ্ট হয়েছে, গোলের সামনে একাধিক ব্যর্থতা এসেছে। অন্যদিকে নরওয়ে ছিল শৃঙ্খলাবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী এবং পরিকল্পনায় অবিচল। আর্লিং হলান্ডের দুটি গোল কেবল একটি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেনি; বিশ্ব ফুটবলে নরওয়ের নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশেরও ঘোষণা দিয়েছে। প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে তারা প্রমাণ করেছে, ফুটবলে ইতিহাস গড়ে দেয় নামের জৌলুস নয়, মাঠের পারফরম্যান্স।
নরওয়ের কোচ স্তলে সুরবাকেনের মন্তব্য আধুনিক ফুটবলের এক গভীর সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর ভাষায়, দলীয় ঐক্য, পারস্পরিক আস্থা, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং একটি সুস্থ সংস্কৃতিই তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তি। এই দর্শন শুধু নরওয়ের জন্য নয়, বিশ্বের সব ফুটবল পরাশক্তির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের সমাবেশ কোনো দলের সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়; প্রয়োজন সুসংগঠিত পরিকল্পনা, মানসিক দৃঢ়তা এবং সমষ্টিগত দায়বদ্ধতা। নরওয়ে সেটিই দেখিয়েছে। ফলে তাদের জয় যেমন প্রাপ্য, তেমনি ব্রাজিলের পরাজয়ও আত্মসমালোচনার একটি প্রয়োজনীয় উপলক্ষ।
তবে এই পরাজয়কে ব্রাজিলের অবসানের প্রতীক হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং এটি ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন প্রেরণা। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ব্রাজিল বহুবার হোঁচট খেয়েছে, আবার দুর্দান্ত শক্তিতে ফিরে এসেছে। ভিনিসিউস জুনিয়রের প্রত্যয়-ব্রাজিলকে আবারো শীর্ষে ফিরিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার সেই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা। এই আত্মবিশ্বাসই ব্রাজিলকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। কারণ ব্রাজিল কেবল একটি দল নয়; এটি ফুটবলের শিল্প, সৃজনশীলতা ও নান্দনিকতার এক অনন্য প্রতীক।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই যে, এখানে জয় যেমন গৌরবের, তেমনি পরাজয়ও শিক্ষার। এক দলের অশ্রুই আরেক দলের ইতিহাস রচনার প্রেরণা হয়ে ওঠে। নেইমারদের চোখের জল কোটি সমর্থকের হৃদয় স্পর্শ করেছে, আবার নরওয়ের উচ্ছ্বাস ফুটবলের ন্যায়সংগত প্রতিদানকেই প্রতিষ্ঠা করেছে। এই নির্মোহ সত্যই বিশ্বকাপকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসরে পরিণত করেছে।
ব্রাজিলের বিদায়ে বিশ্বকাপের আবেগ নিঃসন্দেহে কিছুটা ফিকে হয়েছে। তবু ফুটবল থেমে থাকে না; নতুন নায়ক আসে, নতুন ইতিহাস রচিত হয়। আমরা প্রত্যাশা করি, এই পরাজয়ের শিক্ষা ব্রাজিলকে আরো পরিণত, আরো সুশৃঙ্খল এবং আরো শক্তিশালী করে তুলবে। কারণ বিশ্বকাপের সৌন্দর্যের অন্যতম নাম ব্রাজিল। সেই সৌন্দর্য কখনো একটি পরাজয়ে ম্লান হয় না। অতএব বলাই যায়-ব্রাজিল হারলেও ফুটবলের সৌন্দর্য অম্লান।
সানা/আপ্র/৭/৭/২০২৬