এক মাসে ৪৩৮ জনের মৃত্যু। তাঁদের মধ্যে ৫৮ জন শিক্ষার্থী। এই দুটি সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এগুলো ৪৩৮টি পরিবারের আজীবনের কান্না, ৫৮টি স্বপ্নের অকাল সমাধি এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক নির্মম ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এ ধরনের সংবাদ এখন আর আমাদের চমকে দেয় না। যেন সড়কে প্রতিদিন মানুষের মৃত্যু একটি অনিবার্য বাস্তবতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এত প্রাণহানি কি সত্যিই অনিবার্য? নাকি আমরা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, দুর্বল শাসন, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা এবং দায়হীনতার মূল্য দিচ্ছি?
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের জুন মাসের প্রতিবেদন উদ্বেগকে আরো গভীর করেছে। মাত্র এক মাসে ৪৭২টি দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জনের প্রাণহানি এবং শত শত মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিক সমাজের চিত্র হতে পারে না। নিহতদের মধ্যে ৫৮ জন শিক্ষার্থী থাকার অর্থ হলো, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও আজ সড়কে নিরাপদ নয়। যে রাষ্ট্র তার শিশু, কিশোর ও তরুণদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন-অগ্রগতির পরিসংখ্যান কখনোই পূর্ণতার দাবি করতে পারে না।
দুর্ঘটনার কারণও অজানা নয়। বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, সহজে লাইসেন্স লাভের সুযোগ, যানবাহনের ফিটনেসহীনতা, মহাসড়কে অননুমোদিত ও ধীরগতির যান চলাচল, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, পথচারীবান্ধব অবকাঠামোর অভাব এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা-এসব সমস্যা বছরের পর বছর একইভাবে চিহ্নিত হচ্ছে। কিন্তু সমস্যাগুলো জানা থাকলেও কার্যকর সমাধান বাস্তবায়নে যে ঘাটতি রয়েছে, সেটিই সবচেয়ে বড় সংকট। কেবল অভিযান চালিয়ে, কিছুদিন জরিমানা করে কিংবা দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করে এই মৃত্যুমিছিল থামানো যাবে না।
বিশ্বের যেসব দেশ সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পেরেছে, তারা একটি মৌলিক নীতি অনুসরণ করেছে-মানুষ ভুল করবেই, কিন্তু সেই ভুল যেন মৃত্যুর কারণ না হয়। এ কারণেই তারা সড়ক পরিকল্পনা, যানবাহনের নিরাপত্তা, চালকের দক্ষতা, গতি নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং জরুরি চিকিৎসা-সবকিছুকে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় এনেছে। বাংলাদেশেও এখন সেই বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের বিকল্প নেই।
প্রথমত, সড়ক নিরাপত্তাকে অবকাঠামো নয়, জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চালক নিয়োগ ও লাইসেন্স প্রদান ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, মহাসড়কে গতিসীমা কার্যকর করতে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ক্যামেরা, ডিজিটাল জরিমানা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত তথ্যভিত্তিক তদারকি চালু করা জরুরি। চতুর্থত, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোকে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুনর্নকশা করতে হবে। একই সঙ্গে স্কুল, কলেজ ও জনবহুল এলাকার সামনে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং ও প্রয়োজনীয় উড়ালপথ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার স্বাধীন, পেশাদার ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটিত হয় এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা যায়।
আরো একটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য তৈরি হলেও সেই তথ্যের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ খুব কমই হয়। অথচ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভূ-তথ্য বিশ্লেষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে দুর্ঘটনার সময়, স্থান, কারণ ও ঝুঁকির ধরন বিশ্লেষণ করে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্পূর্ণ সম্ভব। প্রয়োজন কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ।
সড়কে মৃত্যু কোনো নিয়তি নয়; এটি প্রতিরোধযোগ্য। উন্নত বিশ্ব তার প্রমাণ দিয়েছে। তাই বাংলাদেশেরও আর অজুহাত দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ নয়, প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থা; প্রতিটি প্রাণহানির পর সমবেদনা নয়, প্রয়োজন জবাবদিহি; প্রতিটি তদন্ত কমিটির পর প্রতিবেদন নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান বাস্তবায়ন। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রে মানুষের ঘর থেকে বের হওয়া এবং নিরাপদে ঘরে ফেরা ভাগ্যের বিষয় হতে পারে না; এটি নিশ্চিত করার মৌলিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সড়কের এই মৃত্যুমিছিল থামাতেই হবে-আজই, এখনই। আর একটি প্রাণও যেন অবহেলার কাছে হারিয়ে না যায়।
সানা/আপ্র/৭/৭/২০২৬