উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্তের বাস্তবতায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সরকারের জন্য বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশ দিয়েছেন, নতুন বাজেট যেন কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি না করে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর নতুন চাপ না পড়ে।
গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে তিনি এ নির্দেশনা দেন। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার ও এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান উপস্থিত ছিলেন। আয়কর, ভ্যাট ও শুল্কনীতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সম্ভাব্য কর প্রস্তাব ও বাজেটের নীতিগত কাঠামো প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন।
জনজীবনে প্রভাব না ফেলাই মূল বার্তা: বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি কর প্রস্তাব খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করেন এবং জানতে চান সেগুলোর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পড়তে পারে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও তা যেন মানুষের জীবনযাত্রাকে আরো কঠিন না করে।
বৈঠক শেষে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানান, এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শিল্প উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়া, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং এমন করব্যবস্থা গড়ে তোলা যাতে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। নীতিনির্ধারকদের মতে, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অতীতে কর বৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে জনঅসন্তোষ তৈরি হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে এবার সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
নিত্যপণ্যে কর বাড়ানোর প্রস্তাবে আপত্তি: রাজস্ব বাড়াতে ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল, মসলা ও ফলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্থানীয় সরবরাহে উৎসে কর দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছিল এনবিআর। বর্তমানে এ খাতে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ উৎসে কর বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর আশঙ্কা, এ ধরনের সিদ্ধান্ত মূল্যস্ফীতিকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আপাতত নিত্যপণ্যে কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্থগিত থাকতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ এমনিতেই সংকটে রয়েছে। এ অবস্থায় নতুন কর আরোপ বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারত।
করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে: মধ্যবিত্তের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বর্তমানে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত থাকলেও নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে চাকরিজীবী ও ক্ষুদ্র আয়ের করদাতারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।
মোটরসাইকেল ও অটোরিকশায় করের পরিকল্পনা: রাজস্ব বাড়াতে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনাও করছে সরকার। তবে প্রাথমিক প্রস্তাবের তুলনায় করহার কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১১ থেকে ১২৫ সিসি মোটরসাইকেলে ১ হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসিতে ৩ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলে ৫ হাজার টাকা কর আরোপের চিন্তা চলছে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রেও এলাকাভেদে কর নির্ধারণের আলোচনা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা এখন নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের প্রধান বাহন ও জীবিকার উৎস হওয়ায় সরকার এ খাতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
ধনীদের জন্য সম্পদ কর: এবারের বাজেটে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তন হতে পারে সম্পদ কর চালুর মাধ্যমে। বর্তমানে চার কোটি টাকার বেশি সম্পদের ওপর সারচার্জ থাকলেও নতুন প্রস্তাবে সরাসরি নিট সম্পদের মূল্যের ওপর কর আরোপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ৪ থেকে ১০ কোটি টাকার সম্পদে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ, ১০ থেকে ২০ কোটিতে ১ শতাংশ, ২০ থেকে ৫০ কোটিতে ১ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ৫০ কোটির বেশি সম্পদে ২ শতাংশ কর আরোপের চিন্তা রয়েছে।
ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব কর কাঠামোর ইঙ্গিত: প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে স্পষ্ট করেছেন, করনীতি এমন হতে হবে যাতে বিনিয়োগ বাড়ে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হয় এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ শ্রমভিত্তিক শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রফতানি বাড়াতে খাতভিত্তিক বন্ড সুবিধা সম্প্রসারণ, দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ এবং বিনিয়োগ বাড়াতে আলাদা কমিটি গঠনের নির্দেশও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
আইএমএফের চাপ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর চাপ দিয়ে আসছে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার জনগণের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং একই সঙ্গে জনস্বস্তি বজায় রাখা।
সানা/আপ্র/১৬/৫/২০২৬