শেষ বাঁশি বাজতেই যেন পুরো স্টেডিয়াম উল্লাসে বিস্ফোরিত হলো। আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা ছুটে গেলেন একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই টেলিভিশনের ক্যামেরা খুঁজে নিল একজন মানুষকে। তিনি লিওনেল মেসি।
সতীর্থদের বুকে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন তিনি।
এটি পরাজয়ের কান্না নয়।
এটি ছিল বেঁচে থাকার কান্না। স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্ত থেকে ফিরে আসার কান্না। কোটি মানুষের প্রত্যাশার ভার কাঁধে নিয়ে আবারও অসম্ভবকে সম্ভব করার কান্না।
মিশরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা শেষ ১৩ মিনিটে তিন গোল করে ৩-২ ব্যবধানে জিতে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতেই ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত হয়ে ওঠে মেসির চোখের জল।
বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলোও ম্যাচের ফলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে সেই অশ্রুসিক্ত মুহূর্তকেই।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ লিখেছে, ”মেসির অনুপ্রেরণায় মিশরের বিপক্ষে দুই গোল পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করেছে আর্জেন্টিনা।”* প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, পেনাল্টি মিস করার পরও হাল না ছেড়ে তিনি প্রথমে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোকে দিয়ে গোল করান, পরে নিজেই সমতা ফেরান। ম্যাচ শেষে আবেগে ভেঙে পড়া মেসির অশ্রু যেন পুরো প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স লিখেছে, ”মাত্র ১১ মিনিট বাকি থাকতে দুই গোলে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে।” রয়টার্সের ভাষ্য, পেনাল্টি মিসের হতাশা কাটিয়ে মেসিই দলের পুনর্জাগরণের নেতৃত্ব দেন। একটি অ্যাসিস্ট, একটি গোল এবং শেষ পর্যন্ত জয়ের পথ তৈরি করে তিনি আবারও প্রমাণ করেন, সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও তিনিই আর্জেন্টিনার ভরসা।
মার্কিন সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) লিখেছে, ”লিওনেল মেসি আবারও করে দেখালেন।” প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাত্র ১১ মিনিট হাতে থাকতে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও আর্জেন্টিনা ফিরে এসেছে। আর শেষ বাঁশির পর অশ্রুসিক্ত মেসির ছবি হয়ে উঠেছে পুরো ম্যাচের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা তাদের প্রতিবেদনের শিরোনামেই লিখেছে, ”অশ্রুসিক্ত মেসির উদ্যাপন।” তারা বলেছে, মিশরের কাছে অবিশ্বাস্য বিদায়ের শঙ্কা থেকে ফিরে এসে আর্জেন্টিনা শুধু কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেনি, মেসির বিশ্বকাপ-যাত্রাও আরো দীর্ঘ করেছে। সেই স্বস্তিই ধরা পড়েছে তার চোখের জলে।
ব্রাজিলের ক্রীড়া পোর্টাল ‘গে গ্লোবো’ লিখেছে, ”দুই গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার পর মাঠেই কেঁদে ফেলেন মেসি।”* তাদের ভাষ্য, প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিস করে তিনি প্রায় খলনায়কে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে ওঠেন নায়ক।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ‘ইউওএল’ লিখেছে, ”ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার পর মাঠেই অনেকক্ষণ কেঁদেছেন মেসি।”* সতীর্থদের আলিঙ্গনে তার আবেগঘন মুহূর্তকে তারা বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ভারতের ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ লিখেছে, ”মেসির অনুপ্রেরণায় অলৌকিক প্রত্যাবর্তন করে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছে আর্জেন্টিনা।” সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, শেষ ১১ মিনিটে তিন গোল করে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা শুধু ম্যাচই জেতেনি, আবারও দেখিয়েছে কেন তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভয়ংকর প্রতিপক্ষ।
আসলে এই কান্নার পেছনে ছিল আরো গভীর এক গল্প।
৩৯ বছর বয়সী মেসির জন্য এটি সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ। ৬৭ মিনিট পর্যন্ত সবকিছুই বলছিল—এখানেই শেষ হয়ে যাবে তার বিশ্বকাপ অধ্যায়। পেনাল্টি মিস করেছেন, দল দুই গোলে পিছিয়ে, প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু যাঁরা মেসিকে চেনেন, তাঁরা জানেন—তিনি শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত হেরে যান না।
৭৯ মিনিটে তার পায়ের জাদুতে রোমেরোর গোল। ৮৩ মিনিটে নিজের গোল। যোগ করা সময়ে এনসো ফার্নান্দেসের জয়সূচক হেড।
মাত্র ১৩ মিনিটে বদলে যায় ইতিহাস।
তাই শেষ বাঁশি বাজার পর চোখের জল আটকে রাখতে পারেননি মেসি।
সেটি ছিল না কেবল একটি ম্যাচ জেতার আনন্দ।
সেটি ছিল কোটি মানুষের স্বপ্নকে আরো কয়েকটি দিনের জন্য বাঁচিয়ে রাখার স্বস্তি।
সেটি ছিল বিদায়ের দরজা থেকে ফিরে আসা এক কিংবদন্তির নীরব আর্তনাদ।
সেটি ছিল এমন এক কান্না, যা বুঝিয়ে দেয়—রেকর্ড, ট্রফি আর অগণিত সাফল্যের আড়ালেও লিওনেল মেসি শেষ পর্যন্ত একজন রক্ত-মাংসের মানুষ।
আর কখনো কখনো, একজন কিংবদন্তির চোখের জলই হয়ে ওঠে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর ভাষা।
সানা/আপ্র/৮/৭/২০২৬