বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে তিনি ফুটবলের জাদুকর। মাঠে তার বাঁ পায়ের জাদু, অসাধারণ গোল আর একের পর এক রেকর্ড তাকে বসিয়েছে ইতিহাসের অনন্য উচ্চতায়। কিন্তু স্টেডিয়ামের আলো, ক্যামেরার ঝলকানি আর ভক্তদের উন্মাদনার বাইরে লিওনেল মেসির আরেকটি পরিচয় রয়েছে-তিনি একজন পরিবারপ্রিয় মানুষ।
মাঠের বাইরে মেসির সবচেয়ে প্রিয় জায়গা কোনো রাজকীয় মঞ্চ নয়, বরং পরিবারের সঙ্গে কাটানো শান্ত সময়। তাই তার বাড়িগুলো কেবল কোটি কোটি টাকার স্থাপনা নয়; এগুলো একজন বিশ্বতারকার জীবনদর্শন, ব্যক্তিগত পছন্দ এবং পারিবারিক মূল্যবোধের প্রতিচ্ছবি।
মেসির বাড়ির গল্প মানেই শুধু বিলাসিতা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, শেকড়ের টান এবং একজন সাধারণ মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবন কাটানোর আকাঙ্ক্ষা।
বার্সেলোনার পাহাড়-সমুদ্রঘেরা স্বপ্নের ঠিকানা: দীর্ঘ ফুটবলজীবনের সবচেয়ে আবেগঘন সময় কেটেছে স্পেনের বার্সেলোনায়। আর সেই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা ছিল কাস্তেলদেফেলস এলাকার বাড়িটি। পাহাড় ও ভূমধ্যসাগরের মাঝামাঝি অবস্থিত এই অভিজাত এলাকাটি মেসির কাছে শুধু একটি বাসস্থান ছিল না, ছিল পরিবারের নিরাপদ আশ্রয়।
দুই হাজার নয় সালে মেসি এই বাড়িটি কিনেছিলেন। পরে নিজের ব্যক্তিগত পরিসর আরো বাড়াতে পাশের একটি বাড়ি ও জমিও কিনে নেন বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ বিশ্বখ্যাতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মানুষের আগ্রহ, আর সেই আগ্রহের মাঝেও পরিবারের জন্য একটি নিরিবিলি জীবন নিশ্চিত করতে চেয়েছেন তিনি।
বাড়িটিতে রয়েছে সবুজ বাগান, বড় সুইমিং পুল, আধুনিক ব্যায়ামাগার, প্রশস্ত বসার জায়গা এবং একটি ব্যক্তিগত ফুটবল মাঠ। সন্তানদের সঙ্গে খেলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা ব্যস্ত জীবনের বাইরে কিছুটা শান্তি খোঁজা-এই বাড়ির প্রতিটি অংশ যেন সেই উদ্দেশ্যেই সাজানো।
ফুটবল যেখানে তার পেশা, পরিবার সেখানে তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়-মেসির জীবনযাপনে এই দর্শন স্পষ্ট।
বাড়ির ওপর দিয়ে বিমান উড়ে না-সত্য কতটা? মেসির বাড়ি নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত গল্পগুলোর একটি হলো-তার বাড়ির ওপর দিয়ে নাকি কোনো বিমান উড়তে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু বছর ধরে এই তথ্য প্রচলিত রয়েছে।
তবে বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। কাস্তেলদেফেলস এলাকার আশপাশে পরিবেশগত সংরক্ষণ ও বিমান চলাচলের নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। এর সঙ্গে মেসির ব্যক্তিগত বাড়ির কোনো বিশেষ নিষেধাজ্ঞার সম্পর্ক নেই।
অর্থাৎ, মেসির কারণে আকাশপথ বন্ধ-এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিত হয়ে ছড়িয়ে পড়া একটি জনপ্রিয় গল্প।
ফুটবলের আকৃতির বাড়ির রহস্য: মেসির বাড়ি নিয়ে আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো ফুটবলের আকৃতির একটি স্থাপনার ছবি। ওপর থেকে দেখলে বাড়িটি ফুটবলের মতো এবং ‘দশ’ সংখ্যার নকশা তৈরি করে। অনেকেই সেটিকে মেসির নিজের বাড়ি বলে মনে করেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি ছিল একজন স্থপতির কল্পনাভিত্তিক নকশা। মেসির বাস্তব কোনো বাসভবন নয়। ফুটবল ও মেসির বিখ্যাত জার্সি নম্বরকে কেন্দ্র করে তৈরি সেই ধারণাগত নকশাই পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তির জন্ম দেয়।
মায়ামিতে নতুন জীবন, নতুন ঠিকানা: দুই হাজার তেইশ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামি ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর মেসির জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। নতুন দেশ, নতুন লিগ, নতুন পরিবেশ-সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে তিনি বেছে নেন ফ্লোরিডার ফোর্ট লডারডেল এলাকার একটি বিলাসবহুল জলতীরবর্তী বাড়ি।
প্রায় এক কোটি আট লাখ মার্কিন ডলারে কেনা এই বাড়িটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় ভরপুর। এতে রয়েছে ১০টি শয়নকক্ষ, প্রশস্ত বসার জায়গা, আধুনিক রান্নাঘর, সুইমিং পুল, ব্যায়ামের সুবিধা এবং পরিবারের জন্য খোলা জায়গা।
বাড়িটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর অবস্থান। পেছনের অংশে রয়েছে দীর্ঘ জলসীমা এবং ব্যক্তিগত নৌযান রাখার ব্যবস্থা। ফলে বাড়ি থেকেই নৌপথে সমুদ্রে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে মেসির কাছে এই বাড়ির মূল্য শুধু এর দাম বা সৌন্দর্যে নয়। নিরাপত্তাবেষ্টিত পরিবেশ এবং পরিবারের জন্য ব্যক্তিগত সময় কাটানোর সুযোগই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
গাড়িসহ লিফটে ওঠার অভিজ্ঞতা: মেসির সম্পত্তির তালিকায় রয়েছে ফ্লোরিডার বিখ্যাত পোর্শে ডিজাইন টাওয়ারের একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টও।
এই ভবনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো গাড়িবাহী বিশেষ লিফট। বাসিন্দারা নিজেদের গাড়ি নিয়েই লিফটে উঠে সরাসরি নিজস্ব তলার গ্যারেজে পৌঁছাতে পারেন।
বিশ্বের খুব অল্পসংখ্যক আবাসিক ভবনে এমন প্রযুক্তি রয়েছে। ভবনটিতে রয়েছে আধুনিক ব্যায়ামাগার, সুইমিং পুল, স্পা, বিনোদন সুবিধা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিশেষ ব্যবস্থা।
এখানেও মেসির পছন্দের বিষয়টি স্পষ্ট-আড়ম্বরের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা।
জন্মভূমি রোজারিওতে শেকড়ের টান: বিশ্বজয়ের পরও নিজের শেকড় ভুলে যাননি মেসি। আর্জেন্টিনার রোজারিও তার জন্মশহর, শৈশবের স্মৃতির জায়গা।
সেখানে নির্মিত তার বাড়িটি স্থানীয়ভাবে একটি দুর্গের সঙ্গে তুলনা করা হয়। বিস্তৃত জায়গাজুড়ে তৈরি এই আবাসনে রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, বড় বাগান, বিনোদনের ব্যবস্থা এবং গাড়ি রাখার বিশেষ স্থান।
অনেকের ধারণা, ফুটবলজীবনের ব্যস্ততা শেষ হওয়ার পর রোজারিওতেই বেশি সময় কাটাতে চাইবেন মেসি। কারণ বিশ্বখ্যাতির পরও নিজের শিকড়ের প্রতি তার টান অটুট।
বিলাসিতার আড়ালে একজন সাধারণ মানুষ: মেসির বাড়িগুলো দেখলে প্রথমেই চোখে পড়ে অর্থ, সৌন্দর্য ও আধুনিকতার ছাপ। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায় অন্য এক গল্প।
এই বাড়িগুলো মূলত একজন পরিবারের মানুষের চাহিদা থেকে তৈরি। সন্তানদের নিরাপদ পরিবেশ, স্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সময়, বন্ধুদের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবন-এসব বিষয়ই সেখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম ধনী ক্রীড়াবিদ হয়েও মেসি বারবার দেখিয়েছেন, তার কাছে সাফল্যের অর্থ শুধু সম্পদ নয়। পরিবার, শান্তি এবং ব্যক্তিগত সুখও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মেসির বাড়ির অন্দরমহল তাই কেবল দামি আসবাব, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা স্থাপত্যের গল্প নয়। এটি একজন মানুষের গল্প-যিনি মাঠে কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণ করেন, কিন্তু ঘরে ফিরে খুঁজে নেন পরিবারের ভালোবাসা। সেই কারণেই মেসির বাড়িগুলো শুধু প্রাসাদ নয়; এগুলো একজন বিশ্বতারকার মানবিক জীবনের নীরব দলিল।
তথ্যসূত্র: আর্কিটেকচারাল ডাইজেস্ট, আর্কিটেকচারাল ডাইজেস্ট ইন্ডিয়া, স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড, এনডিটিভি স্পোর্টস ও ইউওএল।
সানা/আপ্র/৭/৭/২০২৬