চীনের সাম্প্রতিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ঘিরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং ভূমি, আকাশ ও সমুদ্র-তিন মাধ্যম থেকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা বা ‘পারমাণবিক ত্রয়ী শক্তি’ পূর্ণাঙ্গ করার পথে এগোচ্ছে।
গত ৬ জুলাই প্রশান্ত মহাসাগরে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরল পরীক্ষা চালিয়েছে চীন। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা শিনহুয়া জানিয়েছে, নকল যুদ্ধাস্ত্র বা ‘ডামি ওয়ারহেড’ যুক্ত ক্ষেপণাস্ত্রটি আন্তর্জাতিক জলসীমার দিকে নিক্ষেপ করা হয় এবং নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হানে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটি ঠিক কোথায় গিয়ে পড়েছে, তা প্রকাশ করেনি বেইজিং।
চীনের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক মহলে বিস্ময় ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, এর আগে দেশটি সাধারণত নিজেদের উপকূলের কাছাকাছি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালালেও তা প্রকাশ্যে জানাত না।
গোপন সাবমেরিন বহর নিয়ে উদ্বেগ: পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী সাবমেরিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর গোপনীয়তা। সমুদ্রের গভীরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে এসব সাবমেরিন শত্রুপক্ষের ওপর আকস্মিক হামলার সক্ষমতা রাখে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের ধারণা, চীনের পারমাণবিক সাবমেরিনগুলো অন্তত এক দশক ধরে সমুদ্রে টহল দিয়ে আসছে। তবে বেইজিং কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য স্বীকার করেনি।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা, এবারের পরীক্ষায় চীনের জেএল-২ অথবা জেএল-৩ ধরনের সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
জেএল-২ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার। যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে হলে এটি প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর এলাকা থেকে উৎক্ষেপণ করতে হবে। অন্যদিকে, জেএল-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার, যা চীনের উপকূলীয় জলসীমা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে।
লক্ষ্য কি তাইওয়ান যুদ্ধের প্রস্তুতি? চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পেন্টাগনের মতে, এটি যুদ্ধকালীন পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা যাচাইয়ের অংশ হতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে চীন দ্রুত তার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াচ্ছে। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীনের সক্রিয় পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০০টি। ২০৩০ সালের মধ্যে তা এক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ান ইস্যুতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে তা বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোকে বেইজিংয়ের কৌশলগত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আকাশ থেকেও পারমাণবিক হামলার সক্ষমতা: চীনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির সাবেক অধ্যাপক ওয়াং কিয়াং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারণা দিয়েছেন, চলতি বছর অথবা আগামী বছরের মধ্যে চীন আকাশ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও চালাতে পারে।
এটি সফল হলে চীন পূর্ণাঙ্গ ‘পারমাণবিক ত্রয়ী শক্তি’ অর্জনের সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারবে। অর্থাৎ ভূমি, আকাশ ও সমুদ্র-তিন মাধ্যম থেকেই পারমাণবিক হামলা চালানোর সক্ষমতা তৈরি হবে দেশটির।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ছাড়াও ভারত ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশ সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার অধিকারী।
প্রতিবেশীদের উদ্বেগ: চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সময় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ন্যাটো সম্মেলনের আগে এবং অস্ট্রেলিয়া ও ফিজির মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই পরীক্ষা চালানো হয়।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং চীনের এই পরীক্ষাকে ‘অস্থিতিশীল’ বলে মন্তব্য করেছেন। নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্সও বলেছেন, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরকে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই শক্তি প্রদর্শন শুধু সামরিক সক্ষমতার বার্তা নয়; এটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বেইজিংয়ের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
সানা/আপ্র/৭/৭/২০২৬