পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুতে উত্তর মেরুর অনেক আগেই কীভাবে স্থায়ী বরফের চাদর তৈরি হয়েছিল, সেই প্রাচীন রহস্যের সমাধান খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দীর্ঘমেয়াদি ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন ও ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণেই অ্যান্টার্কটিকায় কোটি কোটি বছর আগে বরফ জমার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
বর্তমানে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পুরু বরফের চাদরে ঢাকা অ্যান্টার্কটিকা একসময় ছিল উষ্ণ ও সবুজে ভরা অঞ্চল। প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে এ অঞ্চলে স্থায়ী বরফের চাদর তৈরি হয়। অথচ পৃথিবীর উত্তর মেরু বা আর্কটিক অঞ্চল আরো প্রায় আড়াই কোটি বছর পর পর্যন্ত বড় ধরনের স্থায়ী বরফের আবরণ পায়নি।
দুই মেরুর বরফ সৃষ্টির এই দীর্ঘ ব্যবধানের কারণ জানতে গবেষকেরা অ্যান্টার্কটিকার ভূসংস্থান বিশ্লেষণ করেছেন। কোটি কোটি বছর ধরে ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তন কীভাবে ঘটেছে, তা পুনর্গঠনে তাঁরা কম্পিউটার মডেলের সহায়তা নিয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার নিচে চলতে থাকা গভীর ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার কারণে একটি পর্বতমালা ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসে। একপর্যায়ে ওই পর্বতাঞ্চল এমন উচ্চতায় পৌঁছে যায়, যেখানে বরফ জমা ও দীর্ঘদিন ধরে তা টিকে থাকার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক ও যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী টমাস গার্ননের মতে, আজ থেকে প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে আফ্রিকা ও অ্যান্টার্কটিকার বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় যে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, কোটি কোটি বছর ধরে চলা সেই পরিবর্তনই নির্ধারণ করে দেয় কখন ও কোথায় পৃথিবীর বড় বরফের চাদর তৈরি হবে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ।
মহাদেশ ভাঙনের প্রভাবেই বদলে যায় অ্যান্টার্কটিকা: একসময় অ্যান্টার্কটিকা ছিল দক্ষিণ গোলার্ধের বৃহৎ সুপার মহাদেশ ‘গন্ডোয়ানা’র অংশ। এই মহাদেশের মধ্যে বর্তমান আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আরব অঞ্চল ও ভারতীয় উপমহাদেশও ছিল।
প্লেট টেকটোনিক প্রক্রিয়ার কারণে কোটি কোটি বছর ধরে এসব ভূখণ্ড ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে। আফ্রিকা অ্যান্টার্কটিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও অ্যান্টার্কটিকা দীর্ঘ সময় অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরে সেটিও আলাদা হয়ে যায়।
গবেষকেরা বলছেন, এই দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের সময় পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তর থেকে ধীরগতির এক ধরনের তরঙ্গ বা আলোড়ন তৈরি হয়, যাকে বলা হয় ‘ম্যান্টল ওয়েভস’। এসব তরঙ্গ ভূত্বকের নিচের ভারী ও ঘন শিলা সরিয়ে দিয়ে মহাদেশীয় ভূখণ্ডকে হালকা করে এবং ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে সাহায্য করে।
এই প্রক্রিয়ার ফলেই পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার কেন্দ্রে গাম্বুরতসেভ পর্বতমালা ও বিশাল মালভূমির সৃষ্টি হয়। বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার ১২০ ফুট উঁচু এই পর্বতমালা পুরোপুরি বরফের নিচে চাপা পড়ে আছে।
উচ্চ ভূমিই তৈরি করেছিল বরফের ভিত্তি: গবেষণায় বলা হয়েছে, ইওসিন যুগের শেষ দিকে অ্যান্টার্কটিকায় স্থায়ী বরফ জমার জন্য ভূমির উচ্চতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিজ্ঞানীদের হিসাবে, প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছালে কোনো অঞ্চল উষ্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও দীর্ঘ সময় বরফ ধরে রাখতে পারে।
কম্পিউটার মডেলের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় সাড়ে ৪ কোটি বছর আগেই পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার বড় অংশ ওই উচ্চতার সীমা অতিক্রম করেছিল।
টমাস গার্নন বলেন, যেমন উঁচু পাহাড়ে উঠলে তাপমাত্রা কমে যায়, তেমনি উঁচু ভূমিতে সারা বছর বরফ জমে থাকার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। প্রায় ৬ কোটি বছর আগে অ্যান্টার্কটিকার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ভূমি বরফ ধরে রাখার মতো উচ্চতায় ছিল। কিন্তু ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে সেই পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছে যায়।
উত্তর মেরুতে দেরিতে বরফ জমার কারণ: গবেষকেরা বলছেন, উত্তর মেরুর পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর্কটিক অঞ্চল মূলত একটি মহাসাগর, যেখানে কোনো বড় স্থলভাগ বা উঁচু পর্বতাঞ্চল নেই।
গত ৫ কোটি বছরে সেখানে হিমবাহের বিস্তার অনেকবার পরিবর্তিত হয়েছে। তবে প্রায় ১ কোটি বছর আগ পর্যন্ত সেখানে স্থায়ী বড় বরফের চাদর তৈরি হয়নি।
বিজ্ঞানীদের মতে, উত্তর মেরুতে স্থায়ী বরফ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ ভূমি না থাকায় সেখানে আগেভাগে বরফ জমার সুযোগ তৈরি হয়নি। পরে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমে পৃথিবীর সামগ্রিক তাপমাত্রা আরো কমে গেলে আর্কটিক অঞ্চলে স্থায়ী বরফ জমতে শুরু করে।
গবেষণাটি আবারো দেখিয়েছে, পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস শুধু বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না; বরং ভূখণ্ডের গঠন, পর্বত সৃষ্টি ও কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনও এতে বড় ভূমিকা রাখে। সূত্র: রয়টার্স
সানা/আপ্র/৭/৭/২০২৬