তথ্যের বিস্ফোরণের এই যুগে শুধু তথ্য নয়, সঠিক তথ্যই শক্তি। আর ওই সঠিক তথ্য যখন অসংখ্য মিথ্যা, অর্ধসত্য, বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা ও পরিকল্পিত প্রচারণার ভিড়ে হারিয়ে যেতে থাকে; তখন সংকট শুধু তথ্যের থাকে না, সংকট তৈরি হয় সত্যের। এমন সময় আগে কখনো আসেনি- যখন একজন সাধারণ মানুষ প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণ তথ্যের মুখোমুখি হয়েছে। স্মার্টফোনের পর্দা খুললেই খবর, মতামত, ভিডিও, ছবি, বিশ্লেষণ, মন্তব্য, গুজব, প্রচারণা- সবকিছু একসঙ্গে হাজির হয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই বিপ্লব নিঃসন্দেহে মানুষের জ্ঞানপ্রাপ্তিকে সহজ করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে- যেখানে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এ বিষয় নিয়েই এবারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পাতার প্রধান ফিচার
আজকের পৃথিবীতে তথ্যের সংকট নেই; বরং সংকট হলো বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের। আর এই বাস্তবতাই গণতন্ত্র, সমাজ, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তিজীবনের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সত্যের সংকট কোনো নতুন ঘটনা নয়। ইতিহাসে ক্ষমতাবানরা বহুবার নিজেদের স্বার্থে তথ্য বিকৃত করেছেন। যুদ্ধের সময় প্রচারণা চালানো হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে গুজব ছড়ানো হয়েছে, জনগণের মতামত প্রভাবিত করার জন্য বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু অতীতের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য হলো গতি এবং ব্যাপ্তি।
আগে একটি গুজব ছড়াতে সময় লাগত। এখন কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি ভুয়া তথ্য লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে কাজ করে যে, আবেগপ্রবণ, চমকপ্রদ বা বিতর্কিত তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সত্য সাধারণত ধীরগতিতে হাঁটে। কিন্তু মিথ্যা প্রায়ই দৌড়ে চলে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম সাম্প্রতিক কয়েক বছরে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যকে বৈশ্বিক ঝুঁকির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ এটি শুধু জনমতকে বিভ্রান্ত করে না; সামাজিক বিভাজন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি তৈরি করে। এই বৈশ্বিক প্রবণতা থেকে বাংলাদেশও আলাদা নয়। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তার কারণে এখানে ভুয়া তথ্যের প্রভাব আরও গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। কোনো দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক ঘটনা, ধর্মীয় ইস্যু কিংবা আন্তর্জাতিক সংঘাতের খবর প্রকাশিত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় অসংখ্য বিভ্রান্তিকর পোস্ট, পুরোনো ছবি, বিকৃত ভিডিও কিংবা মনগড়া ব্যাখ্যা।
অনেক সময় একটি পুরোনো ঘটনার ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়। কখনও ভিডিও সম্পাদনা করে ভিন্ন অর্থ তৈরি করা হয়। আবার কখনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এমন ছবি বা ভিডিও তৈরি করা হয়; যা বাস্তব বলে মনে হলেও আদতে সম্পূর্ণ ভুয়া। এখানেই নতুন উদ্বেগের নাম ‘ডিপফেক’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির ফলে এখন এমন ভিডিও তৈরি করা সম্ভব, যেখানে কোনো ব্যক্তি এমন কথা বলছেন বা এমন কাজ করছেন বলে মনে হয়- যা তিনি বাস্তবে কখনও করেননি। প্রযুক্তির এই সক্ষমতা যেমন সৃজনশীলতার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি সত্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সংকটও সৃষ্টি করেছে। সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের মনস্তত্ত্ব। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সাধারণত এমন তথ্য সহজে বিশ্বাস করে- যা তার পূর্বধারণার সঙ্গে মিলে যায়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘কনফার্মেশন বায়াস’। ফলে কোনো তথ্য সত্য কি মিথ্যা, তা যাচাই করার আগে মানুষ অনেক সময় সেটি নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিই বেশি গুরুত্ব দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ওই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করে। ব্যবহারকারী যে ধরনের কনটেন্ট বেশি দেখেন বা পছন্দ করেন, প্ল্যাটফর্ম তাকে একই ধরনের আরও কনটেন্ট দেখায়। ফলে ধীরে ধীরে মানুষ একটি ‘ইকো চেম্বার’-এর মধ্যে আটকে যায়, যেখানে সে শুধু নিজের মতের প্রতিধ্বনি শুনতে পায়। ভিন্ন মত, ভিন্ন তথ্য কিংবা ভিন্ন ব্যাখ্যা তার সামনে কম আসে। এর ফলে সমাজে মেরুকরণ বাড়ে এবং সত্যের জায়গা সংকুচিত হয়। গণতান্ত্রিক সমাজে এই প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো সচেতন নাগরিকের স্বাধীন সিদ্ধান্ত। কিন্তু যদি নাগরিকের সিদ্ধান্তই ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তাহলে গণতন্ত্রের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভুয়া তথ্যের ব্যবহার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এখন অনেক ক্ষেত্রে একটি কৌশলে পরিণত হয়েছে।
ভুয়া তথ্যের দায় শুধু প্রযুক্তির নয়, মানুষেরও। প্রযুক্তি একটি মাধ্যম মাত্র। আমরা কী দেখছি, কী বিশ্বাস করছি এবং কী শেয়ার করছি, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুঃখজনকভাবে অনেক মানুষ কোনো তথ্য যাচাই না করেই তা অন্যদের কাছে পাঠিয়ে দেন। অনেক সময় তারা বুঝতেও পারেন না যে, তারা একটি গুজবের বিস্তারে ভূমিকা রাখছেন। এই বাস্তবতায় সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। পেশাদার সাংবাদিকতা আজ শুধু সংবাদ পরিবেশনের কাজ করছে না; একই সঙ্গে সত্য যাচাইয়েরও দায়িত্ব পালন করছে। তথ্যের বন্যার মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যম এখন অনেকটা বাতিঘরের মতো; যা মানুষকে বিভ্রান্তির অন্ধকার থেকে পথ দেখাতে পারে।
শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে শুধু সাক্ষরতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ডিজিটাল সাক্ষরতা। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু তথ্য খুঁজে বের করতে শেখালে হবে না, তাকে তথ্য যাচাই করতেও শেখাতে হবে। কোন উৎস বিশ্বাসযোগ্য, কোন তথ্য সন্দেহজনক, কীভাবে ছবি ও ভিডিও যাচাই করতে হয়—এসব দক্ষতা এখন নাগরিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। রাষ্ট্রেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে ভুয়া তথ্য মোকাবিলার নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করার প্রবণতা বিপজ্জনক হতে পারে। তাই প্রয়োজন এমন নীতি- যা একদিকে বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার রোধ করবে, অন্যদিকে নাগরিক স্বাধীনতাও সুরক্ষিত রাখবে।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো নিজেদের কেবল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে না। কারণ তাদের অ্যালগরিদমই আজ কোটি কোটি মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির ধরন নির্ধারণ করছে। ফলে ভুয়া তথ্য শনাক্তকরণ, ফ্যাক্ট-চেকিং ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সত্য কখনও সহজ নয়। অনেক সময় তা অস্বস্তিকর, কখনও রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয়, কখনও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও যেতে পারে। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতি সব সময় সত্য অনুসন্ধানের ওপরই দাঁড়িয়ে থেকেছে।
আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো মিথ্যার অস্তিত্ব নয়; বরং এমন একটি পরিস্থিতি- যেখানে মানুষ আর নিশ্চিত হতে পারে না কোনটি সত্য। যখন সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়, তখন শুধু তথ্য নয়; আস্থাও ভেঙে পড়ে। মানুষ সংবাদমাধ্যমে আস্থা হারায়, প্রতিষ্ঠানে আস্থা হারায়, এমনকি এক সময় পরস্পরের প্রতিও আস্থা হারাতে শুরু করে। সত্যের সংকট মূলত আস্থার সংকট। তাই ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো প্রযুক্তিগত যুদ্ধ নয়; মূলত সত্য, যুক্তি ও মানবিক দায়িত্ববোধ রক্ষার সংগ্রাম।
কেএমএএ/আপ্র/০৫.০৭.২০২৬