ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা করলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। ভাঙচুর করা হয় অনুষ্ঠানস্থলের চেয়ারও। এ ঘটনায় পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায়।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে শহরের পশ্চিম মেড্ডা এলাকার পুলিশ লাইনস মাঠের ড্রিল শেডে এ ঘটনা ঘটে। পরে রাত আড়াইটা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। তাঁরা কনসার্ট বন্ধ, পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং আহত শিক্ষার্থীদের উন্নত চিকিৎসাসহ বিভিন্ন দাবি জানান।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জেলা পুলিশের মাদকবিরোধী সমাবেশ ও শোভাযাত্রা উপলক্ষে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী মঙ্গলবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসেন। এ উপলক্ষে রাতে পুলিশ লাইনসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জেলা পুলিশ। অনুষ্ঠানে ডিআইজি ছাড়াও পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওবায়দুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম রকীব উর রাজা, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলামসহ পুলিশের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ডিআইজি ও পুলিশ সুপার অনুষ্ঠানস্থল থেকে চলে যান। এরপর রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ লাইনসের পশ্চিম পাশে অবস্থিত দারুল আরকাম ইসলামিয়া মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী উচ্চ স্বরে গানবাজনার অভিযোগ তুলে অনুষ্ঠানে গিয়ে বাধা দেন। এতে তাঁদের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের কথা-কাটাকাটি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে শতাধিক মাদ্রাসাশিক্ষার্থী পুলিশ লাইনসে প্রবেশ করে অনুষ্ঠানস্থলের চেয়ার ভাঙচুর করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করলে শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। তাঁদের মধ্যে পুলিশের সাত সদস্য রয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত মাদ্রাসাশিক্ষার্থীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
পুলিশের জেলা গোয়েন্দা শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। রাত সোয়া ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে ডিআইজি ও পুলিশ সুপার পুলিশ লাইনস থেকে চলে যান। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ৩০ থেকে ৪০ জন মাদ্রাসাশিক্ষার্থী প্রধান ফটকের পকেট গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড দিয়ে চেয়ার ভাঙচুর করেন। পরে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
রাতভর বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে বৈঠক: সংঘর্ষের পর মাদ্রাসাশিক্ষার্থীরা পুলিশ লাইনসের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন। এতে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসা শিল্পীরাও সেখানে আটকা পড়েন। পরে শিক্ষার্থীদের আরেকটি দল পুরাতন জেলা রোড, কুমারশীল মোড় ও হাসপাতাল সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। রাত আড়াইটার দিকে তাঁরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন।
ঘটনার পর রাতেই জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম দারুল আরকাম ইসলামিয়া মাদ্রাসায় যান। সেখানে পুলিশ ও মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের নিয়ে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান, পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ, দুই অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ মাদ্রাসার শিক্ষকেরা উপস্থিত ছিলেন।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, ভোর পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে। উন্মুক্ত কনসার্ট করা যাবে না-মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এমন দাবি জানানো হয়েছে। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল কনসার্ট বন্ধ করা, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং আহত শিক্ষার্থীদের উন্নত চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া। তাঁর দাবি, পুলিশ এসব দাবি মেনে নিয়েছে এবং পুলিশ সুপার দায়িত্বে থাকা তিন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার কথা জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী বলেন, তিনি রাতে অনুষ্ঠানস্থল থেকে চলে এসেছিলেন। পরে ঘটনা শুনেছেন। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সুপারসহ অন্য কর্মকর্তারা রাতভর ব্যস্ত ছিলেন বলে তিনি জানান।
পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফের বক্তব্যের জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, মাদ্রাসাটি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান প্রতিষ্ঠিত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সংঘর্ষ ও বিক্ষোভের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।
সানা/আপ্র/২০/৮/২০২৬