প্রকৃতির কাছে মানুষের শেখার শেষ নেই। হাজার বছর ধরে বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির নানা রহস্য উদ্ঘাটন করে নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের পথ তৈরি করেছেন। এবার গবেষকরা এমন এক বিস্ময়কর তথ্য সামনে এনেছেন- যা দেখায় আমাদের চারপাশে থাকা একটি সাধারণ গাছের পাতার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে আধুনিক নগর পরিকল্পনায় ব্যবহৃত এক গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক নকশা। এই আবিষ্কার শুধু উদ্ভিদবিজ্ঞান নয়; গণিত, প্রকৌশল ও ভবিষ্যতের টেকসই শহর নির্মাণের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশন্সে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জনপ্রিয় গৃহস্থালি উদ্ভিদ চায়নিজ মানি প্লান্টের পাতার শিরার বিন্যাসে রয়েছে ভোরোনয় ডায়াগ্রাম নামে পরিচিত একটি গাণিতিক কাঠামো। এই নীতি বর্তমানে নগর পরিকল্পনা, জিআইএস, মোবাইল ফোন টাওয়ারের অবস্থান নির্ধারণ, জরুরি সেবার কেন্দ্র স্থাপন, এমনকি রোবটের চলাচলের পথ নির্ধারণেও ব্যবহৃত হয়।
কী এই ভোরোনয় ডায়াগ্রাম: গণিতের ভাষায় ভোরোনয় ডায়াগ্রাম হলো কোনো একটি এলাকাকে এমনভাবে ভাগ করার পদ্ধতি, যেখানে প্রতিটি অংশ একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দুর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান করে। ধরুন একটি শহরে কয়েকটি হাসপাতাল রয়েছে। শহরের কোন বাসিন্দা কোন হাসপাতালের সবচেয়ে কাছে, সেটি নির্ধারণে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। একইভাবে মোবাইল নেটওয়ার্কে কোন গ্রাহক কোন টাওয়ারের আওতায় থাকবেন কিংবা একটি শহরে কোথায় নতুন ফায়ার স্টেশন স্থাপন করলে সবচেয়ে কার্যকর হবে- এসব ক্ষেত্রেও এই গাণিতিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে এই সত্য যে, মানুষের তৈরি বলে পরিচিত এই গাণিতিক বিন্যাস প্রকৃতি বহু আগেই নিজস্ব নিয়মে ব্যবহার করে আসছে।
পাতায় কীভাবে তৈরি হয় এই নকশা: গবেষকরা পাতার বৃদ্ধি ও শিরার বিকাশ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তারা দেখতে পান, পাতার ভেতরে অক্সিন নামের উদ্ভিদ হরমোনের বিস্তার এবং কোষের বৃদ্ধির কারণে শিরাগুলো এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে- যা স্বাভাবিকভাবেই ভোরোনয় ডায়াগ্রামের মতো একটি কাঠামো তৈরি করে। অর্থাৎ এটি কোনো কৃত্রিম নকশা নয় বা উদ্ভিদ সচেতনভাবে এমন নকশা তৈরি করে না। বরং দীর্ঘ বিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভিদ এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলেছে- যা পুষ্টি ও পানি পরিবহনকে আরও কার্যকর করে এবং পাতার প্রতিটি অংশে প্রয়োজনীয় উপাদান পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।
নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়: গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, প্রকৃতি ও মানুষের উদ্ভাবিত নকশার মধ্যে গভীর গাণিতিক মিল খুঁজে পাওয়া। গবেষকরা বলছেন, শহরের রাস্তার নেটওয়ার্ক, মোবাইল টাওয়ারের কভারেজ, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা কিংবা হাসপাতাল ও স্কুলের অবস্থান নির্ধারণে যে নীতিগুলো ব্যবহার করা হয়, প্রকৃতিও অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের গাণিতিক সমাধান অনুসরণ করে। এর অর্থ এই নয় যে, নগর পরিকল্পনা সরাসরি গাছের পাতা দেখে তৈরি হয়েছে; বরং মানুষের তৈরি গাণিতিক মডেল ও প্রকৃতির স্বাভাবিক বিকাশ একই ধরনের কার্যকর সমাধানে পৌঁছেছে। এই মিল ভবিষ্যতে আরও দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো তৈরিতে বিজ্ঞানীদের নতুন ধারণা দিতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার: বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণা বায়োমিমিক্রি ধারণাকে আরও শক্তিশালী করবে। বায়োমিমিক্রি হলো প্রকৃতির নকশা ও কৌশল অনুসরণ করে নতুন প্রযুক্তি বা প্রকৌশল সমাধান তৈরি করা। ইতোমধ্যে পাখির ডানার গঠন থেকে বিমান, মাছের শরীরের আকৃতি থেকে দ্রুতগতির জাহাজ এবং মাকড়সার জাল থেকে উন্নত নির্মাণসামগ্রী তৈরির ধারণা এসেছে। এখন গাছের পাতার এই গাণিতিক বিন্যাস ভবিষ্যতের স্মার্ট সিটি, পরিবহনব্যবস্থা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিতে পারে।
প্রকৃতিই সবচেয়ে বড় শিক্ষক: বিজ্ঞান বারবার প্রমাণ করেছে, প্রকৃতি কেবল সৌন্দর্যের উৎস নয়; অসংখ্য জটিল সমস্যার কার্যকর সমাধানেরও ভাণ্ডার। একটি সাধারণ গৃহস্থালি গাছের পাতায় লুকিয়ে থাকা গাণিতিক নকশার এই আবিষ্কার সেই সত্যকেই আবার নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। গবেষণাটি মনে করিয়ে দেয়, আমাদের চারপাশের সাধারণ বলে মনে হওয়া জিনিসগুলোর মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে অসাধারণ বৈজ্ঞানিক রহস্য। আর সেই রহস্য উন্মোচনের মধ্য দিয়েই হয়তো তৈরি হবে ভবিষ্যতের আরও বুদ্ধিমান, টেকসই ও প্রকৃতিবান্ধব নগরব্যবস্থা।
কেএমএএ/আপ্র/০৫.০৭.২০২৬