ডেঙ্গু জ্বর হলে শরীরের ওপর একসঙ্গে নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়। উচ্চ জ্বর, শরীরব্যথা, দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা এবং পানিশূন্যতার কারণে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে খেতে পারেন না। এমন অবস্থায় ওষুধের পাশাপাশি সঠিক খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদিও কোনো নির্দিষ্ট খাবার ডেঙ্গু সারিয়ে তুলতে পারে না; তবুও পুষ্টিকর খাবার শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতে, শক্তি ফিরিয়ে আনতে এবং দ্রুত সুস্থ হতে সহায়তা করে। তাই ডেঙ্গুর সময় কী খাওয়া উচিত, এ বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
খাদ্য তালিকায় ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল: ডেঙ্গুর সময় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি প্রয়োজন। এই ভিটামিন শরীরের কোষকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে এবং অসুস্থতার সময় পুষ্টির ঘাটতি পূরণেও ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কমলা, মাল্টা, পেয়ারা, আমলকী, লেবু, স্ট্রবেরির মতো ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল রাখা যেতে পারে। তবে যাদের মুখে ঘা বা অতিরিক্ত অ্যাসিডিটির সমস্যা রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফল নির্বাচন করবেন।
পর্যাপ্ত তরল খাবার খাওয়া: ডেঙ্গু রোগীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো পানিশূন্যতা। জ্বরের কারণে শরীর থেকে প্রচুর পানি বের হয়ে যায়। তাই শুধু পানি নয়, শরীরে তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি। বিশুদ্ধ পানি, ডাবের পানি, লেবুর শরবত, খাবার স্যালাইন, পাতলা ফলের রস কিংবা ঘরে তৈরি স্যুপ নিয়মিত খেলে শরীর হাইড্রেটেড থাকে এবং দুর্বলতা কিছুটা কমে।
শরীরের শক্তি জোগায় প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার: জ্বরের সময় শরীরের কোষ পুনর্গঠন এবং পেশির শক্তি ধরে রাখতে প্রোটিন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই রোগীর ক্ষুধা অনুযায়ী সিদ্ধ ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, ডাল, টক দই কিংবা নরমভাবে রান্না করা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার দেওয়া যেতে পারে। তবে খাবার যেন খুব বেশি তেল-মসলা দিয়ে রান্না না করা হয়। সহজপাচ্য ও হালকা খাবারই এ সময় বেশি উপযোগী।
সহজপাচ্য ফল ও সবজি খাওয়া জরুরি: ডেঙ্গুর সময় অনেকেরই হজমশক্তি কিছুটা দুর্বল হয়ে যায়। তাই এমন ফল ও সবজি খাওয়া উচিত; যা সহজে হজম হয় এবং শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করে। পাকা পেঁপে, কলা, তরমুজ, বাঙ্গি, ডালিম এবং নরম মৌসুমি ফল এ সময় ভালো বিকল্প হতে পারে। একই সঙ্গে লাউ, ঝিঙা, গাজর, কুমড়া, পালং শাকসহ বিভিন্ন সবজি রান্না করে খেলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়। এসব খাবারে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে সুস্থ হতে সহায়তা করে।
স্যুপ ও নরম খাবার খাওয়া: ডেঙ্গুর সময় অনেকেরই ক্ষুধা থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে জোর করে ভারী খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়াই ভালো। চিকেন স্যুপ, সবজির স্যুপ, ডাল স্যুপ, নরম খিচুড়ি কিংবা পাতলা ভাত সহজে হজম হয় এবং শরীরে শক্তিও জোগায়। যারা শক্ত খাবার খেতে পারছেন না, তাদের জন্য এসব খাবার বেশ উপকারী হতে পারে।
পেঁপে পাতার রস নিয়ে সতর্ক থাকা: ডেঙ্গু হলেই অনেকেই পেঁপে পাতার রস খাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে চিকিৎসকদের মতে, এটি প্লেটলেট বাড়াতে নিশ্চিতভাবে কার্যকর- এমন পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া পেঁপে পাতার রস বা অন্য কোনো ভেষজ উপাদানের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। ডেঙ্গুর মূল চিকিৎসা হলো সঠিক পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া।
যেসব খাবার এড়িয়ে চলতে হবে: ডেঙ্গুর সময় অতিরিক্ত তেল, ঝাল, ভাজাপোড়া এবং অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় এবং অ্যালকোহলও এ সময় শরীরের জন্য উপকারী নয়। কারণ এগুলো শরীরে পানিশূন্যতা বাড়াতে পারে এবং সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে।
ডেঙ্গু থেকে দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত তরল, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই কার্যকর উপায়। এর পাশাপাশি জ্বরের সময় নিয়মিত শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। সঠিক চিকিৎসাসহ স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসই ডেঙ্গু থেকে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার অন্যতম সহায়ক।
সূত্র: হেলথলাইন
কেএমএএ/আপ্র/০৫.০৭.২০২৬