একেএম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম: মাত্র ২৪ ঘণ্টার অতি ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা। ডুবে গেছে প্রধান সড়ক, অলিগলি, রেললাইন ও নিচু এলাকার বসতবাড়ি। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানিতে থমকে গেছে নগরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। যান চলাচল ব্যাহত, দুর্ভোগে পড়েছেন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরা। জলাবদ্ধতায় আটকা পড়েছে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে স্থগিত হয়েছে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা।
চট্টগ্রামে এমন ভয়াবহ বর্ষণ ৪২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বৃষ্টিপাতের ঘটনা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিকাল ৩টা থেকে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল। সেই হিসাবে এটি চট্টগ্রামের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাত।
অতি ভারী বর্ষণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জোয়ারের পানি। ফলে নগরের খালগুলো দিয়ে পানি দ্রুত নামতে না পেরে একের পর এক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, চকবাজার, কাপাসগোলা, সিডিএ আবাসিক এলাকা, হালিশহর, রামপুর, বাটালি রোড, রহমতগঞ্জ, জামালখান বাই লেইন, কাস্টম হাউজ, মৌলভীপাড়া, কাঠগড় মুসলিমাবাদসহ নগরের বড় অংশ পানির নিচে চলে যায়।
থমকে গেছে নগরের গতি: মঙ্গলবার সকাল থেকেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল কমে যায়। অনেক এলাকায় রিকশা ছাড়া অন্য যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষকে পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়েছে।
হাটহাজারী-অক্সিজেন সড়কের বড় দিঘির পাড় এলাকায় কোমরসমান পানি জমে যায়। স্থানীয়দের জাল দিয়ে মাছ ধরতেও দেখা যায়। পোর্ট কানেকটিং রোডের হালিশহর থেকে নয়া বাজার পর্যন্ত অংশ, আরাকান সড়কের সিঅ্যান্ডবি ও মৌলভী পুকুরপাড় এলাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানিতে ডুবে যায়।
পতেঙ্গা এলাকায় অতিবৃষ্টিতে একটি বাইপাস সড়কের অংশ ধসে পড়েছে। ইশান মহাজন সড়কে গাছ ভেঙে পড়ে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
রেললাইনে পানি, আটকা পর্যটক এক্সপ্রেস: প্রবল বর্ষণে রেললাইন পানিতে ডুবে যাওয়ায় প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন ষোলশহর এলাকায় আটকা পড়ে।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে ট্রেনটি মুরাদপুর এলাকায় আটকে যায়। রেলওয়ে জানিয়েছে, রেললাইন থেকে পানি না নামা পর্যন্ত ট্রেনটি স্বাভাবিকভাবে চলতে পারেনি। পরে যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ট্রেনটি ষোলশহর স্টেশনে ফিরিয়ে আনা হয়।
স্থগিত পরীক্ষা, দুর্ভোগে শিক্ষার্থীরা: প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম নগরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীন ৪৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ছয়টি কিন্ডারগার্টেনের পরীক্ষাও স্থগিত হয়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরে পরীক্ষার নতুন সময়সূচি ঘোষণা করা হবে।
পাহাড়ধসের আশঙ্কা, নিরাপদে সরানোর উদ্যোগ: টানা বর্ষণে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। আকবর শাহ, বিজয়নগর, শান্তিনগর পাহাড়, মতিরঝর্ণা, আমবাগান, ঠান্ডাছড়ি ও সন্দ্বীপ কলোনিসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
১৬ জেলায় বন্যার সতর্কতা: চট্টগ্রামের পাশাপাশি দেশের ১৬ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুরসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলার নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
একই সঙ্গে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী ও লালমনিরহাটের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলেও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
আরো কয়েক দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস: আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও নিম্নচাপের প্রভাবে আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া অফিস সতর্ক করে বলেছে, টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকলে জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।
সানা/আপ্র/৭/৭/২০২৬