বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন রাতই জন্ম দেয় কিংবদন্তির। যেখানে একদিকে থাকে বিদায়ের অন্ধকার, অন্যদিকে অমর হয়ে ওঠার আলো। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ঠিক তেমনই এক মহাকাব্য রচনা করল আর্জেন্টিনা। ৬৭ মিনিট পর্যন্ত দুই গোলে পিছিয়ে, অধিনায়ক লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিস, সামনে অনুপ্রাণিত মিশরের দুর্ভেদ্য রক্ষণ—সব মিলিয়ে যখন শিরোপাধারীদের বিশ্বকাপযাত্রা শেষ বলেই মনে হচ্ছিল, তখনই যেন জেগে উঠল চ্যাম্পিয়নের আসল রূপ। শেষ ১৫ মিনিটে তিন গোলের ঝড়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে রুদ্ধশ্বাস নাটকের পর কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিল আর্জেন্টিনা।
বিশ্বের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলো ম্যাচটিকে আখ্যা দিয়েছে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনগুলোর একটি হিসেবে। অনেকেই লিখেছে, এটি শুধু একটি জয় নয়; এটি ছিল মেসির নেতৃত্ব, আর্জেন্টিনার মানসিক দৃঢ়তা এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়ার অনন্য উদাহরণ।
শুরু থেকেই বলের দখল, আক্রমণ এবং সুযোগ সৃষ্টিতে এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু ফুটবল যে কেবল পরিসংখ্যানের খেলা নয়, সেটিই প্রমাণ করল মিশর। ১৫ মিনিটে মারওয়ান আতিয়ার কর্নার থেকে ইয়াসের ইব্রাহিমের দুর্দান্ত হেডে এগিয়ে যায় আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।
গোল হজমের মাত্র ছয় মিনিট পরই সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ আসে। নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে ফাউল করায় পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের নেওয়া স্পট কিক অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবাইর। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় আর্জেন্টাইন সমর্থকদের গ্যালারি।
এরপরও থামেনি আক্রমণ। ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড, হুলিয়ান আলভারেজের শট, মেসির দূরপাল্লার প্রচেষ্টা—একটির পর একটি আক্রমণ ব্যর্থ করে ম্যাচের নায়ক হয়ে উঠছিলেন শোবাইর। প্রথমার্ধ শেষ হয় মিশরের ১-০ গোলের লিডে।
দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা আরও মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার মূল্য দিতে হয় ৬৭ মিনিটে। মোহাম্মদ সালাহর নেতৃত্বে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ থেকে হাইসেম হাসানের নিখুঁত পাস পেয়ে জিকো দ্বিতীয় গোল করলে যেন পুরো স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ হয়ে যায়। স্কোরলাইন তখন ২-০। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায় যেন সময়ের অপেক্ষা।
কিন্তু মহান দলগুলোকে আলাদা করে তাদের হার না মানা মানসিকতা।
৭৯ মিনিটে লিওনেল মেসির অসাধারণ ক্রসে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো শক্তিশালী হেডে ব্যবধান কমান। সেই গোলই যেন নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দেয় আর্জেন্টিনাকে।
মাত্র চার মিনিট পর আসে সেই বহুল প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। মিশরের রক্ষণভাগের ভুলে গনসালো মন্তিয়েলের পাস পেয়ে প্রথম স্পর্শেই জোরালো শট নেন মেসি। গোলরক্ষক শোবাইর বল স্পর্শ করলেও সেটি ক্রসবারে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। কয়েক মিনিট আগেও যে দল বিদায়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে ছিল, তারা মুহূর্তেই ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে আনে।
তবে নাটক তখনও শেষ হয়নি।
যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে লাওতারো মার্তিনেজের নিখুঁত ক্রসে এনসো ফার্নান্দেসের দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়াতেই বিস্ফোরিত হয় আর্জেন্টাইন উল্লাস। ২-০ থেকে ৩-২—মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলে স্কালোনির দল।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই আবেগে ভেঙে পড়েন লিওনেল মেসি। সতীর্থদের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে দেখা যায় তাকে। গ্যালারিতেও তখন আনন্দ আর অশ্রুর অপূর্ব মিশেল। ফুটবলপ্রেমীরা বুঝতে পারছিলেন, এটি কেবল একটি নকআউট ম্যাচের জয় নয়; এটি এমন এক লড়াই, যা হয়তো বিশ্বকাপের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
হারলেও মিশর মাথা উঁচু করেই বিদায় নিয়েছে। দুর্দান্ত সংগঠিত রক্ষণ, কার্যকর পাল্টা আক্রমণ এবং গোলরক্ষক মোস্তফা শোবাইরের অসাধারণ নৈপুণ্যে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দম বন্ধ করে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস এবং মেসির জাদুকরী ছোঁয়াই পার্থক্য গড়ে দেয়।
একটি পেনাল্টি মিস দিয়ে শুরু হওয়া রাত শেষ হলো মেসির গোল, একটি অ্যাসিস্ট এবং অশ্রুসিক্ত হাসিতে। আর আর্জেন্টিনা লিখল এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর প্রত্যাবর্তনের এক অনন্য অধ্যায়।
সানা/আপ্র/৮/৭/২০২৬