গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

প্রগতিশীল আর প্রতিক্রিয়াশীলে বিভক্ত

উদীচীতে কী ঘটছে?

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১০:৩৩ পিএম, ২৯ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ২০:০৫ এএম ২০২৬
উদীচীতে কী ঘটছে?
ছবি

ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী—যে সংগঠন একসময় গণমানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ছিল—আজ নিজেই বিতর্ক, বিভাজন এবং আদর্শিক সংঘাতের কেন্দ্রে। সাম্প্রতিক একটি ব্যঙ্গচিত্রকে ঘিরে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি ঘটনার প্রতিফলন নয়; বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা দ্বন্দ্বের বিস্ফোরণ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

বিতর্কের কেন্দ্র: ব্যঙ্গচিত্র, রাজনীতি ও ইতিহাস
উদীচীর ব্যানারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে আঁকা একটি ব্যঙ্গচিত্র সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এই ঘটনাকে ঘিরে সংগঠনটির ভেতরে দুই ধরনের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে—একটি পক্ষ এটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে দেখছে, অন্য পক্ষ একে “ইতিহাস বিকৃতি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে উদীচীর একজন কেন্দ্রীয় নেত্রী সৈয়দা রত্নার গত শনিবার (২৮ মার্চ) রাতে নিজের ফেসবুক আইডিতে লেখা একটি পোস্ট নতুন করে বিতর্ক উসকে দেয়। তিনি সরাসরি সংগঠনের একটি অংশকে “আদর্শচ্যুত” বলে আখ্যা দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, সংগঠন দখল ও সাইবার আক্রমণের অভিযোগ তোলেন।

অভিযোগের রাজনীতি বনাম পাল্টা বয়ান
রত্নার বক্তব্যে উঠে আসে, একটি গোষ্ঠী সংগঠনের ভেতরে সংঘবদ্ধভাবে প্রভাব বিস্তার করে “মব সংস্কৃতি” চালু করেছে। তার অভিযোগের তীর জামশেদ আনোয়ার তপন ও হাবিবুল আলমসহ সংশ্লিষ্টদের দিকে, যাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, নারী নিপীড়ন ও সাংগঠনিক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ এই অভিযোগকে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে দাবি করছে এবং বলছে, উদীচীর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, ভিন্নমত দমন করতেই এসব অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে।


উদীচীর ইতিহাস—কোথা থেকে যাত্রা?
এই সংকট বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় উদীচীর শিকড়ে। ১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর বিপ্লবী কথাশিল্পী সত্যেন সেন-এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় উদীচী। তার সঙ্গে ছিলেন রণেশ দাশগুপ্তসহ একদল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মী।

সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল—

১। শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন
২। সংস্কৃতিকে গণমানুষের আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার
৩। শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান।

শুরু থেকেই উদীচী গান, নাটক, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনসচেতনতা গড়ে তুলেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও সংগঠনের কর্মীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট গড়ে তোলেন।


সাংস্কৃতিক আন্দোলনে উদীচীর অবদান
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী শুধু একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংগঠনটি দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং বিভিন্ন গণআন্দোলনে উদীচী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। এসব আন্দোলনে তারা গান, নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করেছে এবং সংগ্রামী চেতনা জাগ্রত করেছে।

উদীচীর অন্যতম বড় অবদান হলো গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টি করা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সংগঠনটি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বিস্তৃত করে সাধারণ মানুষকে সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্ত করেছে।

এছাড়া উদীচী সবসময় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। তারা ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

সংগীত, নাটক, নৃত্য, আবৃত্তি ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে উদীচী গণমানুষকে সম্পৃক্ত করেছে এবং সংস্কৃতিকে মানুষের জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছে। এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে সংগঠনটি একুশে পদক লাভ করে।
উদীচীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বহু প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব, যেমন সত্যেন সেন ও রণেশ দাশগুপ্ত, যারা দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করেছেন। যাদের অনেকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।


সাম্প্রতিক সংকট: ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নাকি আদর্শিক বিভাজন?
সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা অনেকের মতে দীর্ঘদিনের আদর্শিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ।
সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন—
“উদীচীর ভেতরের এই দ্বন্দ্ব আসলে দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রতিফলন।”

অন্যদিকে প্রবীণ সাংস্কৃতিক কর্মীদের কেউ কেউ অনানুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করছেন—
“সংগঠনটি যে আদর্শ নিয়ে গড়ে উঠেছিল, সেই আদর্শের প্রশ্নেই এখন সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে।”

যদিও এ বিষয়ে সর্বজনস্বীকৃত কোনো একক বিশিষ্টজনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো সামনে আসেনি, তবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মহলে উদ্বেগ স্পষ্ট—উদীচীর মতো সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেশের সাংস্কৃতিক ধারার জন্য অশনিসংকেত।


বর্তমান বাস্তবতায় দুই উদীচী
বর্তমানে কার্যত দুই ধরনের বয়ান সামনে এসেছে—

১। এক পক্ষ নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক হিসেবে দাবি করছে
২। অন্য পক্ষ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।

এই দ্বন্দ্ব এখন সাংগঠনিক সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

সামনে কোন পথ?
উদীচীর ইতিহাস বলে—সংকট তাদের নতুন নয়। ১৯৯৯ সালে যশোরে বোমা হামলার মতো ভয়াবহ ঘটনাও তারা অতিক্রম করেছে। কিন্তু বর্তমান সংকট ভিন্ন—এটি বাহ্যিক নয়, অভ্যন্তরীণ।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে সমাধানের জন্য প্রয়োজন—
* স্বচ্ছ তদন্ত
* অভ্যন্তরীণ সংলাপ
* আদর্শিক অবস্থান পরিষ্কার করা।

নচেৎ, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এই ঐতিহ্যবাহী প্ল্যাটফর্মটি স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

অবশেষে
উদীচী শুধু একটি সংগঠন নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংগ্রামের প্রতীক। সেই সংগঠন যখন নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন তা পুরো সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রশ্ন এখন একটাই—উদীচী কি আবার তার আদর্শিক ঐক্যে ফিরবে, নাকি বিভক্তির পথেই এগোবে?
সানা/আপ্র/২৯/৩/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

পীরগঞ্জে পৌর ভবনের ছাদ ধসে দুই শ্রমিকের মৃত্যু, দায় কার?
১৪ অক্টোবর ২০২৬

পীরগঞ্জে পৌর ভবনের ছাদ ধসে দুই শ্রমিকের মৃত্যু, দায় কার?

তদন্ত কমিটি গঠন; মামলায় আসামি ৯

পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সরছে সচিবালয়, হবে নতুন সড়ক
১১ অক্টোবর ২০২৬

পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সরছে সচিবালয়, হবে নতুন সড়ক

প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা

স্ত্রী হত্যার অভিযোগে শুরু, ১২ বছরে ধর্ষণ-খুনের একাধিক অভিযোগ
০৭ অক্টোবর ২০২৬

স্ত্রী হত্যার অভিযোগে শুরু, ১২ বছরে ধর্ষণ-খুনের একাধিক অভিযোগ

মনিরুজ্জামান মাতুব্বরের বিরুদ্ধে অভিযোগ

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে