রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি আপত্তি নতুন নয়। তবে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা তাঁর প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনা পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা, বাংলা সাহিত্যের বিশ্বস্বীকৃত এই কবির প্রতিকৃতি মুছে ফেলতে কারা এতটা মরিয়া? তাঁদের আপত্তির কেন্দ্রে কি ভারতবিরোধিতা, ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি, নাকি আলোচনায় আসার কৌশল?
ঘটনার পেছনে একটিমাত্র কারণ রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই। তবে ঘটনাপ্রবাহ, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতীয় পরিচয়ের ব্যাখ্যা, ভারত সম্পর্কে রাজনৈতিক মনোভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রাজনৈতিক বিরোধের হাতিয়ার করে তোলার প্রবণতা।
দেয়ালচিত্র থেকে বিতর্কের সূত্রপাত
সেগুনবাগিচায় ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর ৫ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে দেয়ালে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়সহ অন্যরা। ৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে নতুন সাজে সেগুনবাগিচার দেয়ালের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব প্রতিকৃতি নিয়ে আপত্তি সামনে আসে।
১০ অক্টোবর দুপুরে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব এ এন এম আয়াসসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কায় তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে; পরে তাঁদের গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের খবরও প্রকাশিত হয়। ঘটনাটির পেছনে কোনো পরিকল্পিত উসকানি ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তদন্ত প্রয়োজন।
ভারতবিরোধিতা কি রবীন্দ্রবিরোধিতায় রূপ নিচ্ছে?
ঘটনাটির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যে ‘ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ’ এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের বাংলাদেশে স্থান দেওয়া নিয়ে আপত্তির কথা এসেছে। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি নিয়ে বিরোধের একটি অংশ ভারতবিরোধী রাজনৈতিক মনোভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু ভারত সরকারের নীতি বা বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব নিয়ে সমালোচনা করা এবং রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক অবদান অস্বীকার করা এক বিষয় নয়।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা, সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন, বাণিজ্যিক বৈষম্য কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের সমালোচনা করা নাগরিকের অধিকার। কিন্তু এসব প্রশ্নের জবাব হিসেবে কোনো সাহিত্যিকের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়া যুক্তির বদলে প্রতীকী শত্রু তৈরির পথ। রবীন্দ্রনাথের জন্ম ব্রিটিশ শাসিত ভারতে, মৃত্যু ১৯৪১ সালে। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালে। ফলে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিলেন- এমন দাবি ইতিহাসের সময়রেখার সঙ্গেই অসংগত। তাঁর কোনো লেখা বা বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা থাকলে তা প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা উচিত, প্রতিকৃতি বিকৃত করে নয়।
জাতীয় পরিচয়ের দ্বন্দ্বে রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিতর্কের গভীরে রয়েছে বাংলাদেশি পরিচয়ের ব্যাখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য। একদিকে ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবোধ; অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয়কে জাতীয়তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা। এই দুই ধারার টানাপোড়েন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুদিনের।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ও রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে এই আদর্শিক দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটিতে দেখানো হয়েছে, রবীন্দ্রনাথকে কখনো হিন্দু আধিপত্যবাদী বা ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং তাঁর লেখা জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবিও বারবার সামনে আসে। গবেষকের বিশ্লেষণে, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই বিতর্ককে উসকে দেয়।
তবে ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া মানেই রবীন্দ্রবিরোধী হওয়া নয়, যেমন বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করা মানেই কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের সমর্থক হওয়া নয়। সমস্যাটি তৈরি হয় যখন একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অন্য পরিচয়ের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়। তখন সাহিত্য, গান ও শিল্পের মূল্যায়ন আর নান্দনিকতা বা চিন্তার ভিত্তিতে হয় না; বরং কে কোন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় শিবিরের, সেটিই হয়ে ওঠে বিচারের মাপকাঠি।
জাতীয় সংগীত নিয়ে আপত্তি কতটা যুক্তিসংগত?
রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। সংবিধানের ৪ অনুচ্ছেদে গানটির প্রথম ১০ পঙ্ক্তিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ জাতীয় সংগীত, পতাকা ও প্রতীক আদেশেও এ স্বীকৃতি রয়েছে।
জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি কেউ তুলতে পারেন। গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রীয় প্রতীক নিয়েও বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, সাংবিধানিক অবস্থান এবং জনমতের যুক্তিপূর্ণ আলোচনা প্রয়োজন। ‘গানটি অন্য ভূখণ্ডে রচিত’ বা ‘এর রচয়িতা ভারতীয়’- এমন বক্তব্য দিয়ে একে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। কোনো সৃষ্টির জন্মপরিস্থিতি আর পরবর্তী সময়ে একটি জাতির ইতিহাসে তার ভূমিকা এক বিষয় নয়।
‘আমার সোনার বাংলা’ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় গানটি বাংলাদেশের মানুষের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয় এবং পরে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়। অর্থাৎ এর তাৎপর্য শুধু রচয়িতার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের ইতিহাসে গানটির নিজস্ব অবস্থান রয়েছে।
আলোচনায় আসার কৌশলও কি থাকতে পারে?
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল ঘটনাটিকে আলোচনায় আসার চেষ্টা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বক্তব্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গুরুত্বহীন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জনদৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। এটি তাঁর বিশ্লেষণ; আটক ব্যক্তিদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হিসেবে এখনই একে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলা যাবে না।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারব্যবস্থা বিবেচনায় এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ারও কারণ নেই। বিতর্কিত বক্তব্য, প্রতীকী অবমাননা কিংবা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড দ্রুত আলোচনায় আসে। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরিচিতি পেতে পারে, নিজেদের মতাদর্শ প্রচারের সুযোগ পেতে পারে। কিন্তু কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়া আর তার পেছনে পরিকল্পিত প্রচারকৌশল থাকার প্রমাণ এক নয়। এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
উৎসবের আগে উত্তেজনার ঝুঁকি
ঘটনাটি শারদীয় দুর্গাপূজার আগে ঘটেছে। এ সময় ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং গুজব ঠেকানো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তবে পূজার আগে ঘটনাটি ঘটেছে বলেই একে পরিকল্পিতভাবে পূজাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা বলা যাবে না। এমন যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া গেলে তা তদন্তের ভিত্তিতে প্রকাশ করা উচিত।
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হবে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং কোনো গোষ্ঠীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দায়ী না করা। প্রতিকৃতি বিকৃত করার অভিযোগের তদন্ত যেমন প্রয়োজন, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানো বা সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ থাকলে তারও প্রমাণভিত্তিক বিচার হওয়া দরকার।
প্রতিকৃতি মুছলে কি ইতিহাস মুছে যায়?
গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ডা. আব্দুন নূর তুষার বলেছেন, জ্ঞানী-গুণী মানুষ কোনো ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ নন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হকও প্রতিকৃতি মোছার চেষ্টাকে সামাজিক অধঃপতনের লক্ষণ হিসেবে দেখেছেন। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেয়ালচিত্র আবার আঁকা হবে। এসব বক্তব্যে একটি অভিন্ন বার্তা রয়েছে: সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অসম্মান করে কোনো সমাজের মর্যাদা বাড়ে না।
রবীন্দ্রনাথের কোনো লেখা, চিন্তা বা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমালোচনা থাকলে তা গবেষণা, পাঠ, যুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে করা যায়। কিন্তু প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়া কোনো সমালোচনার বিকল্প নয়। বরং এটি প্রশ্ন তোলে- ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার মতো আত্মবিশ্বাস কি আমাদের কমে যাচ্ছে?
রবীন্দ্রনাথের ওপর ক্ষোভের কারণ তাই শুধু একজন কবিকে ঘিরে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতীয় পরিচয়ের ব্যাখ্যা, ভারতবিরোধী মনোভাবের সীমা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রাজনীতির দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনোযোগ পাওয়ার প্রতিযোগিতা। তবে নির্দিষ্ট ঘটনায় কার উদ্দেশ্য কী ছিল, তা তদন্তের আগেই নিশ্চিত করে বলা যাবে না।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় কোনো একক ব্যক্তি, দল বা মতাদর্শের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করা কিংবা তাঁর কোনো রচনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা- দুটিই আলোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসকে অস্বীকার করে, বিদ্বেষ ছড়িয়ে কিংবা শিল্পকর্ম বিকৃত করে জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা যায় না। একটি দেয়ালচিত্র মুছে ফেলা সম্ভব; কিন্তু একটি জাতির ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে কোনো সৃষ্টির সম্পর্ক মুছে ফেলতে হলে তার চেয়ে অনেক গভীর যুক্তি প্রয়োজন।
সানা/আপ্র/১১/১০/২০২৬