ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ চতুর্দশ লিওর ফুসফুসে ক্যানসার শনাক্ত এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আক্রান্ত অংশ অপসারণের খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রোমের জেমেল্লি হাসপাতালে ৭১ বছর বয়সী পোপের ডান ফুসফুসের নিচের অংশ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাদ দেওয়া হয়। অস্ত্রোপচারটি প্রায় ৯০ মিনিট স্থায়ী হয়।
ভ্যাটিকানের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়, অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত কোনো জটিলতা দেখা দেয়নি। ভ্যাটিকানের এক চিকিৎসা-বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জ্ঞান ফেরার পর পোপ স্বাভাবিক ছিলেন। কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখার পর তাঁকে হাসপাতালের নিজস্ব কক্ষে স্থানান্তর করা হয়।
অস্ত্রোপচারের সময় অপসারণ করা ফুসফুসের টিস্যু পরীক্ষায় ‘পালমোনারি অ্যাডেনোকারসিনোমা’ শনাক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি ফুসফুসের ক্যানসারের একটি সাধারণ ধরন। অস্ত্রোপচারের আগে করা পরীক্ষাতেও ক্যানসারের সন্দেহ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পোপের প্রধান শল্যচিকিৎসক স্তেফানো মার্গারিটোরা এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসক লুইগি কার্বোনের নেতৃত্বে ভিডিও-সহায়তাপ্রযুক্তিতে অস্ত্রোপচারটি করা হয়। ভ্যাটিকানের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যানসার আক্রান্ত টিস্যু অপসারণের উদ্দেশ্যে ফুসফুসের ওই অংশটি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। রোগটি শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়েছে কি না, তা জানতে আরো পরীক্ষা চলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় পোপের ফুসফুসে একটি অস্বাভাবিক গুটি ধরা পড়ে। পরে চিকিৎসকেরা সেটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণের পরামর্শ দেন। তবে তাঁর শরীরে অসুস্থতার কোনো লক্ষণ ছিল না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশ্য কর্মসূচি বাতিলের কথা: প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুস্থ হয়ে উঠতে পোপের প্রায় এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হতে পারে। আগামী ২০ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁর সব প্রকাশ্য কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে বলে ভ্যাটিকানের বরাত দিয়ে জানানো হয়।
গত রোববার সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে প্রার্থনা শেষে সমবেত মানুষের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় পোপ নিজেই ফুসফুসে গুটি শনাক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, এটি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়েছে এবং নির্দিষ্ট একটি অংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।
তবে ক্যানসারের পর্যায়, লসিকাগ্রন্থিসহ শরীরের অন্য কোথাও রোগটি ছড়িয়েছে কি না এবং পরবর্তী চিকিৎসার ধরন কী হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুসফুসের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ স্টিফেন লিউ রয়টার্সকে বলেন, রোগের পূর্বাভাস বুঝতে টিউমারের আকার এবং লসিকাগ্রন্থিতে ক্যানসার ছড়িয়েছে কি না, তা জানা জরুরি।
তাঁর ভাষ্য, ক্যানসার ছোট হলে এবং লসিকাগ্রন্থিতে না ছড়ালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেই রোগ নিরাময় সম্ভব হতে পারে। তবে চূড়ান্ত পরীক্ষায় ক্যানসারের বিস্তার বেশি পাওয়া গেলে পরিস্থিতি কম আশাব্যঞ্জক হতে পারে।
সুস্থতা কামনায় হাসপাতালে ভক্তদের ভিড়: পোপের অস্ত্রোপচারের খবর ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভ্যাটিকানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্ডিনাল পিয়েত্রো পারোলিন মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, অস্ত্রোপচারের খবর তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছে। তবে অসুস্থতা দ্রুত শনাক্ত হওয়া এবং পোপের শান্ত থাকার বিষয়টি তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার ব্যাপারে আশাবাদী করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
পোপের সুস্থতা কামনায় মঙ্গলবার রোমের জেমেল্লি হাসপাতালের বাইরে জড়ো হন অনেকে। তাঁরা শুভকামনা জানাতে ও প্রার্থনা করতে সেখানে অপেক্ষা করেন। হাসপাতালে যাওয়ার সময় গাড়ির পেছনের জানালা দিয়ে হাত নেড়ে তাঁদের শুভেচ্ছার জবাব দেন পোপ। হাসপাতালে পৌঁছে কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মেলানোর পর তিনি ভেতরে প্রবেশ করেন।
দক্ষিণ আমেরিকা সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা: প্রতিবেদনে রয়টার্সের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আগামী ৬ থেকে ১৭ নভেম্বর উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও পেরু সফরের কথা রয়েছে পোপের। ১১ দিনের এ সফরের মধ্যে পেরু গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটিতে তিনি বহু বছর বিশপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে নির্ধারিত সময়ে সফরে যেতে পারবেন কি না, তা তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার ওপর নির্ভর করবে।
১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে রবার্ট প্রেভোস্ট নামে জন্ম নেওয়া পোপ চতুর্দশ লিও ২০২৫ সালের মে মাসে ক্যাথলিক চার্চের প্রধান নির্বাচিত হন। তিনি পোপ ফ্রান্সিসের উত্তরসূরি। টেনিস খেলা ও সাঁতার কাটার মতো শারীরিক কর্মকাণ্ডে অভ্যস্ত পোপের গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার কথা আগে জানা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ১৯৮৫ সালে পেরুতে থাকার সময় টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে তাঁকে একবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল।
ভ্যাটিকানের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোপ হাসপাতালে থাকলেও দৈনন্দিন কার্যক্রম চলবে। তবে যেসব সিদ্ধান্তে পোপের স্বাক্ষর বা অনুমোদন প্রয়োজন, সেগুলো তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠা পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৪/১০/২০২৬