ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে তরুণদের প্রস্তাবিত বিক্ষোভ সমাবেশ ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ ও প্রশাসন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আগামীকাল শনিবার (১০ অক্টোবর) ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচি সামনে রেখে বিভিন্ন রাজ্যে ধরপাকড়, যাতায়াতে বিধিনিষেধ এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বিক্ষোভে অংশ নিতে আসা প্রায় ১০ হাজার কর্মী ও সমর্থককে আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে আয়োজক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি। তবে আটকের এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর সমাবেশ ঘিরে আগ্রহ আরো বেড়েছে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের অভিনেতা প্রকাশ রাজও সংহতি প্রকাশ করেছেন। আয়োজকদের আশঙ্কা, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার আগেই তাঁদের নেতাদের আটক করা হতে পারে। অন্যদিকে, পুলিশ জানিয়েছে, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন, বাধা এলেও তাঁরা যন্তর মন্তরের কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ করে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, কারাবন্দি করা কিংবা গুলির মুখে পড়ার ভয়েও তাঁরা পিছু হটবেন না। তাঁর অভিযোগ, সংগঠনের মুখপাত্র দীপক বালিয়ান ও তাঁর ভাইকে রাজস্থান পুলিশ মারধর করে আটক রেখেছে।
আয়োজকদের দাবি, বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যে প্রায় ১০ হাজার কর্মী ও সমর্থককে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে শিক্ষার্থী, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সদস্য এবং রাজনৈতিক কর্মীরাও রয়েছেন। সংগঠনটির যুগ্ম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, পুনে থেকে একদল শিক্ষার্থীকে আটক করে বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁদের কোথায় রাখা হয়েছে, তা জানা যাচ্ছে না। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনেও বিভিন্ন স্থান থেকে তরুণ শিক্ষার্থীদের আটকের অভিযোগ এবং তাঁদের কোথায় নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে পুলিশের কাছ থেকে স্পষ্ট তথ্য না পাওয়ার কথা উঠে এসেছে।
আন্দোলনকারীদের ভাষায়, এটি গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই। ধ্রুব রাঠি ঘোষণা দিয়েছেন, ৮ অক্টোবর তিনি বেঙ্গালুরুতে থাকবেন এবং ১০ অক্টোবরের কর্মসূচিতে অংশ নিতে সবাইকে দিল্লিতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রকাশ রাজও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সমর্থন জানিয়েছেন।
রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তার কঠোর বলয়: শনিবারের কর্মসূচি ঠেকাতে দিল্লি পুলিশের প্রায় ২০ হাজার সদস্য মোতায়েনের প্রস্তুতির কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আধা সামরিক বাহিনীর প্রায় ২৩ হাজার সদস্যকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জম্মু-কাশ্মির, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকেও কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের আনার কথা বলা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের আটক করে নিয়ে যাওয়ার জন্য দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলো থেকে কয়েক শ বাস রাজধানীতে আনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়াম ও ছত্রসাল স্টেডিয়ামসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অন্তত ১০টি স্টেডিয়াম চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রয়োজনে বিক্ষোভকারীদের সেখানে একাধিক দিন আটকে রাখার প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছে। তবে আটককেন্দ্রের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
দিল্লির বাইরের রাজ্যগুলো থেকে বিক্ষোভকারীদের আসা ঠেকাতে রেল চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। শনিবার ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলস্টেশনে আসা মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেসব ট্রেন শুক্রবার দুপুর ২টার পর যাত্রা শুরু করে শনিবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই দুই স্টেশনে পৌঁছানোর কথা, সেগুলোর যাত্রাও বাতিল করা হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ওই এলাকায় যানজট ও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রেল চলাচলে আগের দিনের বিধিনিষেধের কারণে প্রায় পাঁচ হাজার যাত্রী ট্রেনে উঠতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন স্টেশনে বিশেষ পুলিশি নজরদারির পাশাপাশি রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ ও হরিয়ানার সঙ্গে দিল্লির সীমান্ত এলাকাতেও তল্লাশি ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়েছে।
৫৭টি মেট্রো স্টেশনে বিধিনিষেধ: বিক্ষোভকারীদের রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে যাওয়া ঠেকাতে দিল্লির মেট্রো চলাচলেও ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। শুক্রবার রাত ৯টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ৫৭টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বহির্গমন পথ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী এসব স্টেশনে ট্রেন চলাচলের ব্যবধানও বাড়ানো হতে পারে। বিধিনিষেধ কত দিন থাকবে, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
কেন্দ্রীয় দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ছাড়াও উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম দিল্লির বিভিন্ন স্টেশন এই ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। উদ্দেশ্য, বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভকারীদের একত্র হয়ে যন্তর মন্তর কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাওয়ার সুযোগ সীমিত করা।
এর আগে বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচি ঘিরেও দিল্লির কিছু এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার অভিযোগ উঠেছিল। এবারের বিক্ষোভেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশনার তথ্য পাওয়া যায়নি।
পশ্চিম উত্তর প্রদেশের কৃষকনেতারা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নিজেরাও কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার কথা বলেছেন। তাঁদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে পুলিশ তৎপর রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
হোটেল, যানবাহন ও জনসমাগমেও নিয়ন্ত্রণ: দিল্লির বিভিন্ন হোটেল, ছাত্রাবাস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে অর্থের বিনিময়ে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে, এমন বাড়িতে পুলিশ তল্লাশি চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাইরে থেকে আসা তরুণ-তরুণীদের আশ্রয় না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। পাহাড়গঞ্জ এলাকার হোটেলমালিকদেরও দুই দিনের জন্য নতুন অতিথি বুকিং না নিতে বলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভয় দেখানোর অভিযোগও তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবাইকে সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়ে কেউ যেন হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেন। মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুক্রবার ও শনিবার দিল্লির মদের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অ্যাপভিত্তিক ভাড়ার গাড়ির চলাচল নিয়ন্ত্রণেও পুলিশ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করছে। রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় মানুষের চলাচল সীমিত রাখাই এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
নাগরিক সাংবাদিকদেরও সতর্কবার্তা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওর মাধ্যমে আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তরুণ কনটেন্ট নির্মাতাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশাসন বিশেষভাবে সতর্ক। আগের কর্মসূচিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব লক্ষ করার পর এবার নাগরিক সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র দৃশ্যমানভাবে বহন করতে এবং সরাসরি সম্প্রচারের সময় পুলিশের কাজে বাধা সৃষ্টি না করতে বলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, শনিবার যন্তর মন্তরের দিকে অননুমোদিত কাউকে যেতে দেওয়া হবে না। তবে কর্মসূচির অনুমতি, আটক ব্যক্তিদের সংখ্যা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার কিছু বিবরণ নিয়ে আয়োজক ও প্রশাসনের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে সব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধ। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সংশোধনের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং এতে বিরোধী সমর্থকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। সরকার ও নির্বাচন কমিশন অবশ্য এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
শনিবারের কর্মসূচিতে ধ্রুব রাঠি, অভিজিৎ দিপকে ও তাঁদের সমর্থকেরা শেষ পর্যন্ত কতটা অংশ নিতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। একদিকে আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, অন্যদিকে রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ও যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। ফলে ভোটাধিকার, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে এই কর্মসূচি ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
সানা/আপ্র/৯/১০/২০২৬