হিমালয়ের পাহাড়ি বনে মোনালের ডাক একসময় ছিল প্রকৃতির স্বাভাবিক সুরের অংশ। এখন সেই ডাকও বদলে যাচ্ছে। পর্যটকদের ভিড়, যানবাহনের শব্দ ও মানুষের কোলাহলের মধ্যে নিজেদের ডাক সঙ্গীদের কাছে পৌঁছে দিতে কণ্ঠস্বরের কম্পাঙ্ক বাড়াচ্ছে মোনাল। শুধু ডাক নয়, মানুষের দখল ও জলবায়ু পরিবর্তনের যৌথ চাপে বদলে যাচ্ছে পাখিটির আবাসস্থলও। উপযোগী পরিবেশের সন্ধানে তাকে ক্রমেই পাহাড়ের উঁচু এলাকায় সরে যেতে হচ্ছে।
ভারতের গবেষকদের একাধিক গবেষণায় হিমালয়ের এই নান্দনিক পাখিটির ওপর মানুষের ক্রমবর্ধমান চাপের এমন চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণাগুলো বলছে, মানুষের কর্মকাণ্ড শুধু মোনালের বসবাসের জায়গাকে সংকুচিত করছে না, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে তার আচরণেও পরিবর্তন আনছে।
মোনাল হিমালয়ের পাহাড়ি বনাঞ্চলের স্থানীয় পাখি। পুরুষ মোনালের সবুজ, নীল ও তামাটে রঙের ঝলমলে পালক সহজেই মানুষের নজর কাড়ে। সৌন্দর্যের পাশাপাশি হিমালয় অঞ্চলের সংস্কৃতি ও লোকজ পরিচয়ের সঙ্গেও পাখিটি গভীরভাবে যুক্ত। ভারতের উত্তরাখন্ডের রাজ্য পাখি মোনাল; নেপালের জাতীয় পাখিও এটি।
কিন্তু মানুষের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মোনালের জীবন। কোথাও পর্যটন ও অবকাঠামো উন্নয়নের চাপে সংকুচিত হচ্ছে আবাসস্থল, কোথাও মানুষের তৈরি শব্দের সঙ্গে পাল্লা দিতে বদলাতে হচ্ছে তার ডাক।
কোলাহলের মধ্যে বদলে যাচ্ছে ডাক: মোনালের ডাকের ওপর মানুষের শব্দদূষণের প্রভাব জানতে উত্তরাখন্ডের কেদারনাথ মাস্ক ডিয়ার স্যাংচুয়ারির দুটি উপত্যকা বেছে নেন গবেষকেরা। চোপতা উপত্যকা ব্যস্ত পর্যটন ও তীর্থকেন্দ্র; সেখানে সড়ক, যানবাহন, পর্যটক ও তীর্থযাত্রীর আনাগোনা বেশি। অন্যদিকে মাধমহেশ্বর উপত্যকা তুলনামূলক নিরিবিলি এবং সেখানে সড়ক যোগাযোগও নেই।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে এক বছর ধরে দুই এলাকায় মোনালের ৭০০টির বেশি ডাক রেকর্ড করেন গবেষকেরা। স্বয়ংক্রিয় শব্দ ধারণকারী যন্ত্রের সাহায্যে এসব রেকর্ড সংগ্রহ করে ডাকের কম্পাঙ্ক, তীব্রতা ও স্থায়িত্বের সঙ্গে আশপাশের শব্দের মাত্রা তুলনা করা হয়। প্রকাশিত গবেষণায় মোট ৭১৯টি ডাক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অপেক্ষাকৃত শব্দপূর্ণ পরিবেশে থাকা মোনাল শান্ত এলাকার পাখিদের তুলনায় বেশি কম্পাঙ্কে ডাকছে। মানুষের তৈরি শব্দের মধ্যেও নিজেদের ডাক পৌঁছে দিতে তারা কণ্ঠস্বরের উচ্চতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের ডাকার স্থায়িত্বেও পার্থক্য দেখা গেছে।
পরিবর্তনটি এত সূক্ষ্ম যে মানুষের কানে সহজে ধরা পড়ে না। কিন্তু শব্দ ধারণকারী যন্ত্রে সেই পার্থক্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। গবেষকেরা এটিকে পরিবেশের সঙ্গে মোনালের আচরণগত খাপ খাওয়ানোর একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তবে এর ফলে পাখিটির কণ্ঠস্বর স্থায়ীভাবে বদলে যাচ্ছে বা বিবর্তনগত পরিবর্তন ঘটছে - এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
গবেষক রাজীব লোচন বলেন, শব্দপূর্ণ পরিবেশে মোনালের কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন প্রজাতিটির পরিবেশগত চাপের সঙ্গে আচরণগত নমনীয়তার ইঙ্গিত দেয়।
পাখির ডাক শুধু শব্দ নয়, তাদের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সঙ্গী খোঁজা, প্রজনন, নিজের এলাকা সম্পর্কে সংকেত দেওয়া এবং প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে যোগাযোগসহ নানা কাজে ডাকের ভূমিকা রয়েছে। ফলে পরিবেশের কারণে ডাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ঘটলে প্রজনন ও সামাজিক আচরণেও প্রভাব পড়তে পারে। তবে মোনালের ক্ষেত্রে এমন দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিশ্চিত করতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
পুনের ফ্লেম ইউনিভার্সিটির জননীতি বিভাগের অধ্যাপক অঞ্জল প্রকাশ বলেন, কোনো প্রজাতিকে যখন মানুষের যানবাহনের শব্দের ওপর দিয়ে শোনানোর জন্য কণ্ঠস্বর উঁচু করতে হয়, তখন তা হিমালয়ের জীববৈচিত্র্যের ওপর মানুষের ক্রমবর্ধমান চাপেরই একটি ইঙ্গিত।
এবার বদলাচ্ছে ঠিকানাও: মোনালের ওপর মানুষের চাপ শুধু শব্দে সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনও বদলে দিচ্ছে পাখিটির উপযোগী আবাসস্থল।
রাজীব লোচন ও তাঁর সহগবেষকদের ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলে মোনালের সম্ভাব্য আবাসস্থলের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উত্তরাখন্ড ও হিমাচল প্রদেশসহ ভারতীয় হিমালয়ের বিভিন্ন এলাকার তথ্য ব্যবহার করে ২১০০ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য পরিবর্তনের মডেল তৈরি করা হয়।
গবেষণায় ৫ হাজারের বেশি উপস্থিতির তথ্য বিশ্লেষণ করে মোনালের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আবাসস্থলের উপযোগিতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে উপযোগী আবাসস্থলের অবস্থান ও স্থিতিশীলতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন মোনালের আবাসস্থল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস হলো, শতাব্দীর শেষভাগে মোনালের বর্তমান উপযোগী আবাসস্থলের বড় অংশ অস্থিতিশীল বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি উষ্ণায়নের পরিস্থিতিতে ২১০০ সালের দিকে বর্তমান উপযোগী আবাসস্থলের মাত্র ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। তবে বিভিন্ন জলবায়ু পরিস্থিতিতে কিছু নতুন এলাকাও মোনালের জন্য উপযোগী হয়ে উঠতে পারে। সমস্যা হলো, এসব নতুন এলাকা বিচ্ছিন্ন বা ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত না হলে তা প্রজাতিটির দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, মোনাল পাহাড়ের বিভিন্ন উচ্চতায় মৌসুমি চলাচল করে। জলবায়ুর পরিবর্তনে যদি উপযোগী পরিবেশের পরিসর সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে তাদের চলাচলের পথও সংকুচিত হতে পারে। আবাসস্থল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে এক এলাকার পাখির সঙ্গে অন্য এলাকার পাখির প্রজননের সুযোগ কমে যেতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এতে জনসংখ্যাগত বিচ্ছিন্নতা ও প্রজাতিটির টিকে থাকার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মোনাল আসলে হিমালয়ের সংকেত: গবেষকেরা মোনালকে শুধু সৌন্দর্যের পাখি হিসেবে দেখছেন না। পরিবেশের পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল হওয়ায় এটি হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। মোনালের আবাসস্থল ও আচরণে পরিবর্তন দেখা গেলে একই ভূদৃশ্যে বসবাসকারী অন্য সংবেদনশীল প্রাণী ও পাখির ওপরও পরিবেশগত চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
হিমালয়ের পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা পরিবেশকর্মী বিশাল সিং বলেন, মোনালের ডাক ও আবাসস্থলের পরিবর্তন শুধু একটি প্রজাতির সংকট নয়; এটি বৃহত্তর পরিবেশগত পরিবর্তনের সতর্কসংকেত।
গত এক দশকে হিমালয়ের বহু এলাকায় পর্যটন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুত বেড়েছে। নতুন সড়ক, পর্যটনকেন্দ্র, যানবাহন ও মানুষের বাড়তি আনাগোনায় দুর্গম এলাকাগুলোও আগের তুলনায় সহজলভ্য হয়েছে। এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন বেড়েছে, তেমনি বন্য প্রাণীর ওপর মানুষের চাপও বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাপমাত্রা, তুষারপাত ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন।
মোনালকে নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো তাই একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনছে - উন্নয়নের নামে হিমালয়ের নীরবতা কতটা ভাঙা যায়, আর প্রকৃতির সীমা কতটা অতিক্রম করা যায়?
মানুষের কোলাহলে টিকে থাকতে মোনালকে যখন নিজের ডাক বদলাতে হয়, আর জলবায়ু ও মানুষের দখলের চাপে যখন তাকে নিজের আবাসস্থল ছেড়ে আরো উঁচুতে উঠতে হয়, তখন সেটি কেবল একটি পাখির পরিবর্তনের গল্প থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একটি বিপন্ন পরিবেশের ভাষা।
মোনালের ডাক তাই হয়তো শুধু মোনালের ডাক নয় - তার ভেতর দিয়ে হিমালয়ের প্রকৃতিই মানুষের কাছে নীরবতা, নিরাপদ আবাসস্থল ও সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী একটি বিষয় বিশেষভাবে সতর্কতার সঙ্গে রাখা হয়েছে: মোনালের ডাক বদলানোকে এখনই স্থায়ী বিবর্তনগত পরিবর্তন বলা যাচ্ছে না; গবেষকেরা এটিকে পরিবেশের সঙ্গে আচরণগত খাপ খাওয়ানোর প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
সানা/ডিসি/আপ্র/৭/১০/২০২৬