এক বছর হয়ে গেল। লালনের গান গেয়ে যিনি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন, সেই ফরিদা পারভীন নেই। তাঁর কণ্ঠ থেমে গেছে, কিন্তু তাঁর গাওয়া সুর এখনো ছড়িয়ে আছে মানুষের স্মৃতিতে, লালনের আখড়ায়, সংগীতের আসরে এবং অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়ে। অথচ কিংবদন্তি এই শিল্পীর প্রথম প্রয়াণবার্ষিকী পেরিয়ে গেল অনেকটাই নীরবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় কোনো আয়োজন হয়নি। বড় কোনো আনুষ্ঠানিকতা চোখে পড়েনি। ছিল না সেই আড়ম্বর, যা একজন জাতীয় পর্যায়ের শিল্পীর স্মরণে প্রত্যাশিত হতে পারে।
গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হন লালনসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীন। কিডনি সমস্যা ও ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগে তাঁর জীবনাবসান হয়। এক বছর পর তাঁর স্বামী, বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিমের কণ্ঠে তাই যেমন প্রিয় মানুষটিকে হারানোর গভীর শোক, তেমনি রয়েছে শিল্পীর উত্তরাধিকার ধরে রাখার এক কঠিন লড়াই। তবে আক্ষেপ থাকলেও কারো প্রতি কোনো অভিযোগ বা অনুযোগ নেই তাঁর।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বড় পরিসরে কোনো স্মরণ অনুষ্ঠান না হলেও নিজেদের গড়ে তোলা অচিন পাখি সংগীত একাডেমির উদ্যোগে ছোট পরিসরে স্মরণ করা হয়েছে ফরিদা পারভীনকে। রোববার সন্ধ্যায় ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশনের অচিন পাখি সংগীত একাডেমিতে কোরআন খতম, দোয়া ও স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কুষ্টিয়াতেও হয়েছে নানা আয়োজন। লালনের আখড়ায় গিয়ে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করেছেন গাজী আবদুল হাকিম।
তিনি বলেন, “অচিন পাখিতে কার্যক্রম চলছে। কোরআন খতম হয়েছে, দোয়া, স্মরণসহ আরো কিছু আয়োজন হয়েছে। কুষ্টিয়াতেও হয়েছে। কয়েক দিন আগে আমি কুষ্টিয়ায় লালনের আখড়ায় গিয়ে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করেছি। যেখানে তাকে কবর দেওয়া হয়েছে, সেখানে একটি এতিমখানা আছে। সেখানে কাজ করছি। ওনার কবরটাও বাঁধাই করেছি। সব মিলিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
ফরিদা পারভীনের স্মরণে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর বড় পরিসরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের একটি মিলনায়তনে অচিন পাখি একাডেমির এই আয়োজনে একাডেমির শিক্ষার্থীরা গান ও কবিতা পরিবেশন করবে। বাইরের কয়েকজন শিল্পীকেও আমন্ত্রণ জানানো হবে।
একা মানুষ, একা একাডেমি
ফরিদা পারভীন নেই। কিন্তু তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান অচিন পাখি এখনো চলছে। ঢাকার তেজকুনি পাড়ার হোন্ডার গলিতে ১৭ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশনের অচিন পাখি সংগীত একাডেমি। উদ্দেশ্য ছিল পাঁচ দশক ধরে ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে চর্চিত লালনসংগীতকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। আজ সেই প্রতিষ্ঠানই টিকে আছে প্রবল অর্থসংকটের মধ্যে।
গাজী আবদুল হাকিম বলেন, “অচিন পাখি একাডেমি আগের মতই চলছে, আমাদের ফান্ড নাই, আমরা খুব অভাবের মধ্যেই চলি। তারপরও আমার যতটুকু সামর্থ্য, তা দিয়েই চালাচ্ছি। আগে তো দুইজনে বেশি খরচ করতাম। দুইজনের খরচের ওপর চলত, গায়ে লাগত না তখন। এখন তো একদম একা।”
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার সংকটও রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, “সরকারিভাবে একাডেমির জন্য আমরা এখনও কোনো অনুদান পাই না। আগে বছরে এক লাখ টাকা আসত, সেটাও তিন-চার বছর ধরে বন্ধ। তারপরেও একাডেমি যেভাবে চলে, চলছে।”
একজন শিল্পী চলে গেলে শুধু তাঁর গানই থেকে যায় না, তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রতিষ্ঠান, স্বপ্ন ও সাধনাও টিকে থাকার প্রশ্নে পড়ে। ফরিদা পারভীনের ক্ষেত্রেও যেন সেই বাস্তবতাই সামনে এসেছে। যে একাডেমি দুইজনে মিলে চালাতেন, এখন সেটির ভার একা কাঁধে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তাঁর জীবনসঙ্গী।
‘আমার আক্ষেপ আছে, অভিযোগ নেই’
প্রথম প্রয়াণবার্ষিকীতে রাষ্ট্রীয় বড় আয়োজন না থাকায় আক্ষেপ আছে গাজী আবদুল হাকিমের। তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছেন, উদ্যোগ নেওয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যেই স্মরণ আয়োজন করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি, বারবার চেষ্টা করেছি। তারা যদি কোনো উদ্যোগ নেয় তবে ভালো, আর না নিলে আমার যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে, তার মধ্যেই করব।”
দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “সব মিডিয়া তার স্মরণে অনুষ্ঠান করেছে। রেডিও স্টেশন অনুষ্ঠান করেছে, বিভিন্ন টেলিভিশন স্টেশনও তাকে স্মরণ করেছে।”
তারপরও একটি আক্ষেপ থেকে যায়। তবে সেই আক্ষেপ কারো বিরুদ্ধে অভিযোগে রূপ নেয়নি।
গাজী আবদুল হাকিম বলেন, “আমার আক্ষেপ আছে, কিন্তু কারো প্রতি কোনো অভিযোগ বা অনুযোগ নেই- সরকারের কাছেও না, দেশের ধনীদের কাছেও না, কোনো মিডিয়ার কাছেও না। ফরিদাও নেই, আমার অনুপস্থিতিতে ‘অচিন পাখি’ একাডেমি কতদিন টিকে থাকবে, তা আমার জানা নেই। আমি যে কয়দিন বাঁচব, আমার হাতের বাঁশিটা যে কয়দিন আছে, সে কয়দিন চালাতে পারব। যেদিন আমার হাতের বাঁশিটা ভেঙে যাবে, সেদিন কী হবে তা জানি না।”
এই কথার মধ্যেই যেন শুধু একজন স্বামীর ব্যক্তিগত শোক নয়, একজন শিল্পীর উত্তরাধিকার হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও ধরা পড়ে।
ঘরের কোণে কোণে এখনো ফরিদা
ফরিদা পারভীনের মৃত্যুর পর গাজী আবদুল হাকিমের জীবনে সবচেয়ে বড় শূন্যতার নাম নিঃসঙ্গতা। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী শুধু তাঁর সংসারের মানুষ ছিলেন না, ছিলেন প্রতিদিনের যত্ন, অভ্যাস, শিল্পচর্চা ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
হাকিম বলেন, “তার চলে যাওয়ায় আমার জন্য সবথেকে বড় আঘাত হচ্ছে নিঃসঙ্গতা, সে সারাক্ষণ আমাকে নিয়েই ভাবত। তার ধ্যানে-জ্ঞানে, অচিন পাখি আর আমিই ছিলাম। সকালে চা-নাস্তা খেলাম কি না, দুপুরে খেয়ে কাজে গেলাম কি না, অসুস্থ থাকলেও সে খোঁজ নিত, এখন এসবের বড্ড অভাব বোধ করি। ঘরের প্রতিটি কোণায় এখনও জীবন্ত ফরিদা পারভীনের স্মৃতি। সুর মানেই তো ফরিদা পারভীন, যেখানেই তাকাই তাকে দেখি।”
একজন শিল্পী চলে যাওয়ার পর তাঁর কণ্ঠের অনুপস্থিতি যেমন শ্রোতারা অনুভব করেন, তেমনি কাছের মানুষ অনুভব করেন তাঁর প্রতিদিনের উপস্থিতির অভাব। ফরিদা পারভীনের ক্ষেত্রেও সেই শূন্যতা যেন ঘরের প্রতিটি কোণে, প্রতিটি স্মৃতিতে।
পাঁচ বছর বয়সে গান, লালনে খুঁজে পেলেন নিজের পথ
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরে জন্ম নেওয়া ফরিদা পারভীন বেড়ে ওঠেন কুষ্টিয়ায়। বাবা ছিলেন চিকিৎসক, মা গৃহিণী। সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা ফরিদার গানে হাতেখড়ি মাত্র পাঁচ বছর বয়সে। বাবা-মায়ের উৎসাহে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল নজরুলসংগীতের শিল্পী হওয়ার। সেই পথেই এগোচ্ছিলেন তিনি।
১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারে নজরুলগীতির শিল্পী হিসেবে গান গাইতে শুরু করেন। গেয়েছেন আধুনিক ও দেশের গানও। কিন্তু তরুণ বয়সে লালনের গান তাঁর কাছে ছিল অনেকটাই ‘উপেক্ষিত’। পরে সেই লালনই হয়ে ওঠে তাঁর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
স্বাধীনতার বছরখানেক পর কুষ্টিয়ার ছেঁউরিয়ায় দোল পূর্ণিমার উৎসবে গুরু মোকছেদ আলী তাঁকে লালনের গান গাইতে অনুরোধ করেন। বড় অনিচ্ছায় শুধু গুরুর মান রাখতে একটি গান শেখেন তিনি। গানটি ছিল ‘সত্য বল সুপথে চল’।
ফরিদার নিজের ভাষায়, “তখন আমি খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললাম, ঠিক আছে আমাকে একটা গান শিখিয়ে দেন।”
কিন্তু সেই একটি গানই বদলে দেয় তাঁর শিল্পীজীবনের গতিপথ। লালনের গান গেয়ে তিনি অনুভব করেন এক ধরনের ‘ঐশ্বরিক অনুরণন’। এরপর একে একে গুরু তাঁকে গান শেখাতে থাকেন। আর সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর লালনসংগীতের দীর্ঘ সাধনা।
ফরিদা বলেছিলেন, “যেটা ঐশ্বরিক অনুরণন। আমি শান্তি পাচ্ছিলাম না। আমার মনে হল আমাকে এই গান আরো করতে হবে, এই গান শিখতে হবে। এরপর গুরু আমাকে একটা একটা করে গান শেখাতে লাগলেন। আর এভাবেই লালন গানের শুরু। এখন এই লালন ফকিরই আমাকে সবার প্রাণের মধ্যে উপস্থাপন করেছে। এই গান দিয়ে আমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন বলেই সেদিন ‘সত্য বল সুপথে চল’ গানটি আমাকে দিয়ে করিয়েছিলেন।”
‘রানি’ নয়, চেয়েছিলেন লালনের বাণীর গভীরতা
লালনসংগীতের অনন্য শিল্পী হিসেবে অনেকে ফরিদা পারভীনকে ‘লালনের গানের রানি’ বা ‘সম্রাজ্ঞী’ বলতেন। কিন্তু নিজের জন্য এমন উপাধি পছন্দ করতেন না তিনি। তাঁর কাছে লালনের গান ছিল কোনো উপাধি অর্জনের পথ নয়, ছিল আত্মস্থ করার বিষয়।
তিনি বলেছিলেন, “এসব আমি একদমই পছন্দ করি না। কেউ যদি লালনের বাণীগুলো অন্তর থেকে আত্মস্থ করতে পারে, সে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। এসব নাম দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।”
নতুন প্রজন্মের লালনচর্চা নিয়েও তাঁর আক্ষেপ ছিল। তাঁর মতে, নতুন প্রজন্ম শুদ্ধভাবে লালনচর্চা করছে না। লালনের গান উপস্থাপনার সাম্প্রতিক প্রবণতাকেও তিনি সঠিক মনে করতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, হৃদয়ের গভীর উপলব্ধি ছাড়া লালনের গান ধারণ করা সম্ভব নয়।
লালনের গান ছাড়াও ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়েছে বেশ কয়েকটি আধুনিক ও দেশের গান। ‘তোমরা ভুলে গেছ মল্লিকা দির নাম’ এবং ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। চলচ্চিত্রের গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
লালনের গানকে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও পৌঁছে দিয়েছেন ফরিদা পারভীন। দীর্ঘ সংগীতসাধনার স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা। ১৯৮৭ সালে সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য একুশে পদক পান তিনি। ২০০৮ সালে জাপান সরকারের ‘ফুকুওয়াকা এশিয়ান কালচার’ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৩ সালে সেরা প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
আজ ফরিদা পারভীন নেই। আছে তাঁর গান, আছে তাঁর সাধনা, আছে অচিন পাখি, আছে লালনের বাণীকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অসমাপ্ত স্বপ্ন। প্রথম প্রয়াণবার্ষিকীতে বড় কোনো রাষ্ট্রীয় আয়োজন হয়নি- সেই নীরবতার মধ্যেই হয়তো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একজন শিল্পীর চলে যাওয়ার পর তাঁর উত্তরাধিকার ধরে রাখার কঠিন বাস্তবতা।
আর অচিন পাখির ছোট্ট পরিসরে, স্বামীর একাকী বাঁশির সুরে, শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে লালনের গানে যেন এখনো ফিরে আসেন ফরিদা পারভীন। তিনি নেই, কিন্তু সুরের ভেতর দিয়ে তাঁর চলে যাওয়া শেষ হয়নি।
সানা/আপ্র/১৪/৯/২০২৬