সংস্কারের পর নতুন করে চালু হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি স্থান পেয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়-ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ৭ মার্চের ভাষণ-সংক্রান্ত কোনো ছবি সেখানে দেখা যায়নি।
সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধুর একক বা গৌরবোজ্জ্বল কোনো ছবিও নেই। তবে ১৯৭৪ সালে তাঁর দুই ছেলের বিয়ের একটি ছবি এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত তিনটি পেপার কাটিং রাখা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের একটি খোদাইচিত্রেও বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি রয়েছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ডাকসু ভবনের নিচতলায় সংস্কার করা সংগ্রহশালার উদ্বোধন করেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা। এ সময় ডাকসুর সহ-সভাপতি সাদিক কায়েম, সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদসংস্থা বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরেছে। সংবাদমাধ্যমটি সংগ্রহশালা ঘুরে দেখে জানিয়েছে, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান, পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদীর ওপর হামলা, তাঁর মৃত্যু, সিঙ্গাপুর থেকে মরদেহ দেশে আনা, জানাজা ও দাফন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের ঘটনা ও ব্যক্তিদের ছবি সেখানে স্থান পেয়েছে।
জিন্নাহর তিনটি ছবির একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত অনুষ্ঠানের। ওই অনুষ্ঠানে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে ঘোষণা দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়টি ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের গ্রুপ ছবি। ওই সম্মেলনে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি সংবলিত প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল। তৃতীয়টি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পেপার কাটিং, যাতে জিন্নাহর ছবি রয়েছে।
সংগ্রহশালায় আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, এম এ জি আতাউল গণি ওসমানী, নবাব সলিমুল্লাহ, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ছবিও রয়েছে।
‘ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি’
বঙ্গবন্ধুর ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ছবি কেন সংগ্রহশালায় রাখা হয়নি-জানতে চাইলে ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ‘ফ্যাসিবাদের সব আইকনের’ ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের অংশে বঙ্গবন্ধুর ছবি রয়েছে।
তবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের অংশে বঙ্গবন্ধুর ছবি না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি।’
জিন্নাহর ছবি কেন রাখা হয়েছে জানতে চাইলে জুমা বলেন, ‘আমি জিন্নাহর ছবি রাখিনি, সেই ইভেন্টের ছবি রেখেছি।’
২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনের আগে সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধুর বেশ কয়েকটি ছবি ছিল। ওই নির্বাচনের আগের দিন ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধুর একাধিক ছবি সংবলিত চিত্রও প্রকাশিত হয়েছিল।
ডাকসুর এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির জয়ী হওয়ার পর ওই ছবিগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। তবে এ দাবির বিষয়ে ছাত্রশিবিরের বক্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
যে ইতিহাসগুলো রাখা হয়েছে
সংগ্রহশালার ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের অংশে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের ছবি, আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক পিয়ারু সরদারের ছবি এবং মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ কবিতার উল্লেখ রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের কমান্ডার, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কয়েকজনের ছবি এবং সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবিও রাখা হয়েছে। এসবের নিচে মুক্তিযুদ্ধের একটি খোদাইচিত্র রয়েছে, যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও আছেন।
১৯৭১ থেকে ১৯৮১ সালের অংশে রয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের দুই ছেলের বিয়ের ছবি এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত তিনটি পেপার কাটিং। ‘বাংলাদেশে কোনো বিরোধীদল নেই’ শিরোনামের একটি সংবাদ প্রতিবেদন এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের দুটি ছবিও রয়েছে।
একই অংশে জিয়াউর রহমানের সময়ের খাল খননের দৃশ্য, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার একটি ছবি, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের জিয়াউর রহমানের দুটি ছবি এবং ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালট পেপারের একটি ছবি রয়েছে।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ১৪ ছবি
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ১৪টি স্থিরচিত্র রাখা হয়েছে। এর মধ্যে শহীদ নূর হোসেনের সেই বহুল পরিচিত ছবি রয়েছে, যেখানে তাঁর শরীরে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তিপাক’।
এ ছাড়া ডাকসুর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন ছবি, ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শহীদদের তালিকা এবং শহীদ আসাদকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার দৃশ্যসহ আরো কয়েকটি ছবি রয়েছে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের অংশে রয়েছে ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগ আন্দোলন, বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ও সানি হত্যাকাণ্ড, ২০২০ সালের মোদীবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ছবি।
তবে ১৯৯১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ের বিশেষ কোনো স্থিরচিত্র সেখানে পাওয়া যায়নি।
সংগ্রহশালায় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার একটি ছবিও স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ূন আহমেদ, কবি জসীমউদ্দীন, আবুল কাশেম ফজলুল হক, মুনীর চৌধুরী ও আবুল ফজলসহ বরেণ্য সাহিত্যিকদের ছবিও রয়েছে।
হাদীর গুলিবিদ্ধ হওয়া থেকে দাফন
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদীর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা থেকে শুরু করে সিঙ্গাপুর থেকে তাঁর মরদেহ দেশে আনা, জানাজা এবং কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে দাফনের ছবি সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে।
ডাকসু বোর্ডেও নাম নিয়ে বিতর্ক
সংগ্রহশালার ডাকসু বোর্ডে ২০১৯ সালে নির্বাচিত সহ-সভাপতি নুরুল হক নুরের নাম থাকলেও সাধারণ সম্পাদকের ঘরটি খালি রাখা হয়েছে। ওই নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে জয় পেয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী।
পরবর্তী সময়ে তাঁর ছাত্রত্ব না থাকা অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁর পদ বাতিল করে ওই মেয়াদের ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাশেদ খানকে ঘোষণা করে। রাশেদ খান বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারীর দায়িত্বে রয়েছেন।
সাধারণ সম্পাদকের ঘরটি খালি রাখার কারণ জানতে চাইলে ডাকসুর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, গোলাম রাব্বানী ও রাশেদ খান-দুজনের বিষয়েই বিতর্ক রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, রাব্বানীর ছাত্রত্ব বাতিল হয়েছে, আবার সংশ্লিষ্ট ডাকসু কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে। ফলে তাঁদের কাউকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ না করে ঘরটি খালি রাখা হয়েছে।
সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাবেক প্রার্থী
সবশেষ ডাকসু নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমার নেতৃত্বাধীন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছিলেন নূমান আহমাদ চৌধুরী।
সংগ্রহশালার সংস্কার নিয়ে তিনি আপত্তি প্রকাশ করে বলেন, সংস্কারকাজে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের ভূমিকা ছিল। তাঁর দাবি, সংগ্রহশালা থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি সরিয়ে জিন্নাহর ছবি যুক্ত করা হয়েছে।
নূমানের মতে, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কিত সময়ের কিছু উপাদান রাখা হলেও মুক্তিসংগ্রামে তাঁর নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ছবিগুলো রাখা হয়নি। তাঁর ভাষ্য, এভাবে ইতিহাস উপস্থাপনে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।
ডাকসুর সাবেক এক নেতাও দাবি করেন, এর আগে ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি ছিল না। ছাত্রশিবির ছাত্র সংসদে আসার পর ছবিটি যুক্ত করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
তবে জিন্নাহর ছবি যুক্ত করা কিংবা বঙ্গবন্ধুর ছবি সরিয়ে ফেলার বিষয়ে ছাত্রশিবিরের বক্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
সাবেক কর্মীর দাবি, জিন্নাহর ছবি আগে ছিল না
ডাকসু সংগ্রহশালায় বর্তমানে কোনো তত্ত্বাবধায়ক নেই। এর আগে গোপাল চন্দ্র দাস সেখানে দায়িত্ব পালন করতেন। ডাকসুর ‘গোপাল দা’ নামে পরিচিত এই কর্মী কয়েক বছর আগে অবসরে যাওয়ার পর নতুন করে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
গোপালচন্দ্র দাস বলেন, তিনি ১৯৯১ সাল থেকে ডাকসুতে কাজ করেছেন এবং সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার সময় থেকে বিভিন্ন দুর্লভ ছবি সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর দাবি, তিনি দায়িত্বে থাকা সময়ে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর কোনো ছবি সংগ্রহশালায় ছিল না। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত আমগাছের ছবিটিও তাঁর সংগ্রহ করা বলে জানান তিনি।
বঙ্গবন্ধুর ছবি না থাকার কথা শুনে তিনি বলেন, সংগ্রহশালায় আগে অনেক দুর্লভ ছবি ছিল এবং সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
সংগ্রহশালার বর্তমান বিন্যাসে বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সময়ের ছবি না থাকা এবং জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত হওয়া নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। এ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে, কারা তা নির্ধারণ করেছেন এবং সংগ্রহশালার ঐতিহাসিক উপকরণ নির্বাচনের কোনো লিখিত নীতিমালা রয়েছে কি না-সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পাওয়া যায়নি। সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সানা/আপ্র/১৪/৯/২০২৬