দীর্ঘ ১৪ বছরেও সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন না হওয়ায় এবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে তাদের পরিবার। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগটি গ্রহণ করে বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সাগর-রুনির পরিবারের পক্ষে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির কাছে লিখিত অভিযোগটি দেন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান। অভিযোগে ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার ঘটনায় প্রকৃত হত্যাকারী ও দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার আবেদন জানানো হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, ওই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি আনুমানিক রাত ২টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক গোলাম মোস্তফা সারওয়ার, যিনি সাগর সরওয়ার নামে পরিচিত, এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন নাহার রুনি খুন হন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সরকার ও তদন্তকারী সংস্থাগুলো এ হত্যাকাণ্ডের কোনো কিনারা করতে পারেনি।
থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় হাই কোর্টের নির্দেশে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের নেতৃত্বে সেই টাস্কফোর্স মামলাটির তদন্ত করছে। তবে টাস্কফোর্স গঠনের প্রায় দুই বছর হতে চললেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টি অভিযোগে তুলে ধরেছে পরিবার।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্যরা চান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সুষ্ঠু ও সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত হত্যাকারী ও দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনুক এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। অভিযোগটি কমপ্লেইন্ট রেজিস্টারভুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর ৮ ধারা অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধের যথাযথ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনও জানানো হয়েছে।
অভিযোগ গ্রহণের পর ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সাগর-রুনি হত্যা মামলার বিষয়ে কোনো তথ্য-প্রমাণ বা সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেলে তা সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাকে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সবারই প্রত্যাশা অপরাধীর বিচার হোক। অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং ট্রাইব্যুনাল খতিয়ে দেখবে, তাদের পক্ষে এ বিষয়ে তদন্ত করার কোনো সুযোগ রয়েছে কি না।
প্রধান কৌঁসুলি আরো বলেন, ট্রাইব্যুনালের আনুষঙ্গিক তদন্তে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কোনো তথ্য-প্রমাণ বা কোনো ধরনের যোগসূত্র পাওয়া গেলে তা সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাকে সরবরাহ করা হবে।
এর আগে গত ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ট্রাইব্যুনালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন কিছু তথ্যের কথা জানানো হয়। এরপরই পরিবার ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
ওই সংবাদ সম্মেলনে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর জোহা বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলায় জব্দ করা র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ডিজিটাল অংশ পরে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা জব্দ করে। এসব ডিভাইসে ২০০৭ সাল থেকে জিয়াউল আহসানের বিভিন্ন নথি ও সার্ভারের তথ্য পাওয়া গেছে। মুছে ফেলা কিছু ফাইলও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিন থেকে চারজন সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করার কথা জানান তানভীর জোহা।
একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি আরো বলেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের আগের দিন রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে তৎকালীন র্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে বলা হয়েছিল, পরদিন একটি ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা’ ঘটবে এবং তাকে সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। পরদিন সকালে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামনে আসে।
তানভীর জোহা বলেন, তৎকালীন সরকার বা গণমাধ্যম-সংক্রান্ত কোনো স্পর্শকাতর নথি, ডিস্ক, টেপ বা মেমোরি-সংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র থাকতে পারে বলে তদন্তে তারা ধারণা পেয়েছেন।
সে সময় ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম বলেছিলেন, অভিযোগটি ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের মধ্যে পড়লে তা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরো জানিয়েছিলেন, তদন্তে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে কোনো সামরিক বা র্যাব কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
দীর্ঘদিন পর তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসায় আশাবাদী হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন সাগর-রুনির ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ। তিনি বলেছিলেন, তিনি যথাযথ বিচার চান। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি বা ভুল মানুষকে যেন কোনোভাবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা না হয়, সেই প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
রোববার ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর নওশের আলম রোমান সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনালের কিছু অনুসন্ধান বা তথ্য রয়েছে, যেগুলো থেকে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তাদের মনে হয়েছে।
তিনি বলেন, এতদিন বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করেছে এবং এরই মধ্যে একটি টাস্কফোর্সও তদন্ত করছে। তার পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখুক এবং তারা যেসব তথ্য পাওয়ার কথা বলেছে, কোনো কারণে যেন সেই তদন্ত বন্ধ হয়ে না যায়।
রোমান বলেন, তারা অনেকটা আশা ছেড়েই দিয়েছেন। এখন ট্রাইব্যুনাল যদি কোনো তথ্য পেয়ে থাকে এবং সঠিক প্রমাণের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে পারে, সেটিই তারা অপেক্ষা করে দেখতে চান।
সানা/আপ্র/১৩/৯/২০২৬