বাঙালি জীবনে এক সময় প্রেমিক পুরুষের প্রতিচ্ছবি ছিল শরৎচন্দ্রের দেবদাস। শুধু প্রেমে ব্যর্থই নয়, বরং কাপুরুষ প্রেমিক হিসেবে দেবদাসে পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে। তবুও এমন একটি দায়িত্বহীন, মদ্যপ চরিত্রেই বাঙালি বুঁদ হয়ে রইল বহু বছর। তবে নিজের প্রতি অবিচার করলেও দেবদাস ছিল প্রতিশোধবিহীন এক বিরহী চরিত্র। তাই বাঙালির সঙ্গে নিজেকে দ্রবীভূত করতে পেরেছে। উপন্যাসের প্রেমিকদের ছাপিয়ে ডিজিটাল যুগে এসে বারবার উচ্চারিত হয়েছে, বাস্তব জীবনের এক বিকারগ্রস্ত যুবকের নাম রাজীব। বর্তমান তরুণদের দেবদাস থেকে রাজীব হয়ে ওঠার যাত্রাই বলে দেয়- বাঙালি পুরুষ আর যাই হোক, প্রেমিক হিসেবে নারীদের কাছে আজও নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি। এ বিষয়ে নিয়েই এবারের নারী ও শিশু পাতার প্রধান ফিচার
এক সময়ের তীব্র সামাজিক বিতর্কের জন্ম দেওয়া রাজীব-প্রভা স্ক্যান্ডাল ইস্যুটি দীর্ঘ ১৬ বছর পর আবারও যেন পুনরুজ্জীবিত হলো। শোবিজ জগৎকে কাঁপিয়ে দেওয়া ঘটনাটি যখন এত বছর পর আবারও আলোচনার জন্ম দেয়, তখন তা আধুনিক প্রেম, বিশ্বাসের সংকট এবং সাইবার জগতের আইনি ও নৈতিক দেউলিয়াত্বকে পুনর্বিশ্লেষণ করার তাগিদ দেয়। ডিজিটাল প্রযুক্তি আসার আগে প্রেম প্রতিশোধের প্রকাশভঙ্গি ছিল ভিন্ন। বর্তমানে যেমন চ্যাট হিস্ট্রি প্রকাশ পায়, তখন ফাঁস করা হতো হাতে লেখা চিঠি, রটানো হতো নারীর নামে কুৎসা। নব্বই দশকে প্রেম প্রতিশোধের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল অ্যাসিড সন্ত্রাস। কঠোর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে অ্যাসিড সন্ত্রাসের হার পরে আশানুরূপভাবে হ্রাস করা গেছে। কিন্তু আজ মাউসের এক ক্লিকেই কারও ব্যক্তিগত জীবনকে ইন্টারনেটে এনে পুরো জীবনকে সামাজিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া যায়। একবিংশ শতাব্দীতে প্রেম প্রতিশোধের কদর্য ও ভয়ংকর এই হাতিয়ার হচ্ছে- রিভেঞ্জ পর্নোগ্রাফি- যার প্রত্যক্ষ উদাহরণ উপস্থাপন করেছে রাজীব। সম্পর্কের গভীর মুহূর্তে সর্বোচ্চ ও অন্ধ বিশ্বাস থেকে ধারণ করা ব্যক্তিগত ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার এই ঘটনাকেই বলা হয় রিভেঞ্জ পর্নোগ্রাফি। এতে রাজীব শুধু সাইবার অপরাধই করেনি, বরং ছড়িয়েছে অশ্লীলতা।
প্রভাকে ‘জীবন্ত হত্যা’ করার বিকৃত খেলায় মেতে ওঠা রাজীব পথ দেখিয়েছে অন্য তরুণদেরও। সমাজ বারবার আঙুল তুলেছে প্রভার দিকে, অথচ আজ পর্যন্ত কোনো বিচার হয়নি রাজীবের। তাই আজও প্রেমের নামে কিশোরী, তরুণীরা সাইবার সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে বারবার। কখনও ব্ল্যাকমেইলিং করে তাদের করা হচ্ছে একাধিকবার ধর্ষণ। কিন্তু এতে সমাজ কিংবা রাষ্ট্র মূল অপরাধীর কোনো শাস্তি তো দেয়ই না, উল্টো সামাজিক কাঠগড়ায় তুলে দেয় নারীকে। তাই এর প্রায় ১০ বছর পরে প্রাক্তন প্রেমিকের ফেইক আইডি থেকে অভিনেত্রী মিথিলাকেও শিকার হতে হয় প্রায় একই ধরনের সাইবার সন্ত্রাসের! ইন্টারনেটে আজও যারা এই ধরনের ভিডিও খোঁজে, লিংক শেয়ার করে বা কুৎসিত মন্তব্য ছুড়ে দেয়, সেই অনলাইন মবের অপরাধীদের আইন দিয়ে প্রতিহত করার ন্যূনতম চেষ্টাও কখনও করা হয়নি। ফলে সমাজের কাছে একটি বার্তাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, নারীর একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে তাকে সামাজিকভাবে ধ্বংস করা খুবই সহজ এবং এতে অপরাধীর কোনো শাস্তি হবে না।
যাকে বিয়ে করার জন্য প্রভাকে এমন সাইবার সন্ত্রাসের শিকার হতে হলো, আসুন এবার সেই অপূর্বকে নিয়ে একটু ভাবি। অন্যের বাগদত্তাকে ঝড়ো আবেগের বশে বিয়ে করলেও, ইন্টারনেটে সৃষ্ট সামাজিক ঝড় মোকাবিলা করার মতো সাহস তার ছিল না। প্রভার চূড়ান্ত দুঃসময়ে কাপুরুষের মতো তার হাত ছেড়ে দিয়ে অপূর্ব যেন বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। প্রভার জীবনের সংকটের শুরুর জন্য অপূর্বর দায় কি অস্বীকার করা যায়? বিয়ের এক মাসের মাথায় ডিভোর্স দিয়ে সেই সংকট আরও বাড়িয়ে দেওয়ার দায় কি তার নয়? নাটকের প্রেমিক চরিত্রের সফল রূপদানকারী অপূর্ব বাস্তবে কতটা নির্ভরযোগ্য সে প্রশ্ন তোলাটাও তাই মোটেও অমূলক নয়। বাস্তবে অপূর্ব দেখিয়ে দিলেন, ইচ্ছে হলেই ভালোবাসার নামে যে নারীর হাত ধরা যায়, আবার ইচ্ছে হলেই নিজ স্বার্থে সেই নারীর হাত ছেড়ে দিয়ে পালিয়েও যাওয়া যায়।
ভালোবাসার সম্পর্কের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ হলো ‘বিশ্বাস’। রাজীব-প্রভা-অপূর্ব স্ক্যান্ডাল সেই বিশ্বাসের ভিতকে কাঁপিয়ে দিয়েছে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের মতোই। এ ঘটনা আমাদের আরও বার্তা দেয়, কোনো টক্সিক সম্পর্ক থেকে যদি নারী বের হতেও চায়, তাহলেও এমন রিভেঞ্জ পর্নোগ্রাফি কিংবা হালের ডিপফেইক এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা বিকৃত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার আতঙ্কে থাকতে পারে। এত নেতিবাচকতার মধ্যেও একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। নারীরা এখন আর ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে মুখ বুজে সহ্য করে না। মিথিলা সরাসরি প্রাক্তন প্রেমিকের বিরুদ্ধে মামলা করতে না পারলেও, নিজের প্রাইভেসির সুরক্ষায় আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে এর কোনো সুরাহা হয়নি। মিথিলাকেও অনলাইনে মবের শিকার হতে হয়। আর প্রভা রাজীবের শাস্তি চেয়ে মুখ খুলতে পেরেছেন ১৬ বছর পরে।
প্রভার এমন ঘটনা আধুনিক তরুণীদের শেখায়, ভালোবেসে কাউকে বিশ্বাস করলেও নিজের প্রাইভেসির নিয়ন্ত্রণ আরেকজনের হাতে দেওয়া যাবে না। এমনকি সে প্রেমিক যদি হয় প্রকৃষ্ট প্রেমিক ‘রোমিও’ কিংবা ‘মজনু’র মতো কেউ, তবুও নয়। কারণ আজকের প্রেমিক রোমিও বা মজনু হলেও তার হাতেও থাকবে প্রযুক্তি। তাই প্রেম আজ পরিণত হয়েছে বায়বীয় এক ফ্যান্টাসিতে। আর এর সঙ্গে বিশ্বাসও হয়ে পড়েছে এক ঠুকনো বেলুনমাত্র!
কেএমএএ/আপ্র/২০২৬