বায়ু দূষণ শুধু ফুসফুস ও হৃদ্যন্ত্রের জন্যই ক্ষতিকর নয়, এটি পুরুষের প্রজনন সক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ু দূষণের সংস্পর্শে এলে শুক্রাণুর ডিএনএতে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা পুরুষের উর্বরতা কমার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
আগের বিভিন্ন গবেষণায় বায়ু দূষণের সঙ্গে পুরুষের উর্বরতা হ্রাসের যোগসূত্রের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও এর পেছনের জৈবিক প্রক্রিয়া এতদিন স্পষ্ট ছিল না। নতুন গবেষণাটি সেই প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ‘ডিএনএ মিথাইলেশন’-এর দিকে ইঙ্গিত করেছে। এটি ডিএনএর সঙ্গে যুক্ত এক ধরনের রাসায়নিক পরিবর্তন, যা জেনেটিক কোড না বদলিয়েও কোনো জিন সক্রিয় থাকবে নাকি নিষ্ক্রিয় থাকবে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানিয়েছে, বড় পরিসরের এ প্রজনন গবেষণায় দেখা গেছে, ওজোন ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মতো সাধারণ বায়ু দূষক শুক্রাণুর ডিএনএতে এপিজেনেটিক পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
লন্ডনে অনুষ্ঠিত ‘ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব হিউম্যান রিপ্রোডাকশন অ্যান্ড এমব্রায়োলজি’র বার্ষিক সভায় গবেষণাটির ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। সেখানে গবেষকরা জানান, বায়ু দূষণের সংস্পর্শে আসা পুরুষদের শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়ায় ডিএনএর কার্যপ্রণালিতে পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারিবিদ ড. ক্যারি নোবেলসের নেতৃত্বে পরিচালিত এ গবেষণায় ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের সল্ট লেক সিটির দুই হাজারের বেশি পুরুষ অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীরা গবেষণায় যুক্ত হওয়ার সময় এবং পরবর্তী দুই, চার ও ছয় মাস পর বীর্যের নমুনা দেন।
গবেষকরা নমুনা সংগ্রহের আগের তিন মাসে, অর্থাৎ শুক্রাণু তৈরির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অংশগ্রহণকারীরা ওজোন, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড এবং অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণাসহ বিভিন্ন দূষকের কতটা সংস্পর্শে এসেছিলেন, তার একটি সম্ভাব্য হিসাব করেন।
গবেষণার ষষ্ঠ মাসে নমুনা দেওয়া এক হাজার ২২০ জন পুরুষের শুক্রাণুর ডিএনএ মিথাইলেশন বিশ্লেষণ করা হয়। এতে বায়ু দূষণের মিশ্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত ৩৯টি ডিএনএ পরিবর্তন শনাক্ত করেন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে ওজোন ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
গবেষকদের মতে, ভ্রূণ তৈরির প্রাথমিক পর্যায়ে বেশির ভাগ এপিজেনেটিক পরিবর্তন মুছে গেলেও কিছু জিনে স্থায়ী প্রভাব থেকে যেতে পারে। এসব পরিবর্তন ভবিষ্যতে ভ্রূণের বিকাশ এবং পরবর্তী জীবনের বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় চিহ্নিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জিন হলো ‘জিএনএএস’। এর আগে নিম্নমানের বীর্য এবং ভ্রূণের ত্রুটিপূর্ণ বিকাশের সঙ্গে এই জিনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ড. ক্যারি নোবেলস বলেন, বায়ু দূষণের কারণে শুক্রাণুর ডিএনএ মিথাইলেশনে যে পরিবর্তন ঘটে, তার সঙ্গে পুরুষের উর্বরতার সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্ড্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক অ্যালান পেসি বলেন, গবেষণাটি পরিমাপযোগ্য প্রভাব দেখাতে সক্ষম হয়েছে। তবে শুক্রাণুর ডিএনএ মিথাইলেশনের পরিবর্তন চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পুরুষের বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নিশ্চিত হতে আরো গবেষণা দরকার।
নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজনন জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক রিচার্ড লিও মনে করেন, এই গবেষণা বায়ুবাহিত দূষকের কারণে শুক্রাণুর গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে বিদ্যমান প্রমাণকে আরো শক্তিশালী করেছে।
সূত্র: গার্ডিয়ান
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৮/৭/২০২৬