বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় মিসরের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে শুধু কোয়ার্টার ফাইনালই নিশ্চিত করেনি আর্জেন্টিনা; গড়েছে একের পর এক ইতিহাস। শুরুতে পেনাল্টি মিস করলেও পরে গোল ও একটি গোলে অবদান রেখে দলকে ৩-২ ব্যবধানে জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। এই ম্যাচে ব্যক্তিগত ও দলীয়-দুই ক্ষেত্রেই অসংখ্য নতুন রেকর্ডের জন্ম হয়েছে। ম্যাচের শেষ ১৩ মিনিটে তিন গোল করে ২-০ ব্যবধান থেকে ফিরে আসে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এর আগে শেষ বত্রিশে কেপ ভার্দেকে একই ব্যবধানে হারিয়েছিল লিওনেল স্কালোনির দল।
মিসরের বিপক্ষে ম্যাচে যে উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলো হয়েছে-
টানা ছয় নকআউট ম্যাচে গোলের অনন্য কীর্তি
বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা ছয়টি নকআউট ম্যাচে গোল করার রেকর্ড গড়েছেন মেসি। ২০২২ বিশ্বকাপে শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনালে গোল করার পর চলতি আসরে শেষ বত্রিশ ও শেষ ষোলোতেও জালের দেখা পেয়েছেন তিনি।
দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও ইতিহাস গড়া জয়
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ১৫ মিনিট বাকি থাকতে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও নির্ধারিত সময়ে জয় পাওয়া প্রথম দল এখন আর্জেন্টিনা। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের ইতিহাসে শিরোপাধারী কোনো দল হিসেবে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচ জয়ের প্রথম নজিরও গড়েছে তারা।
প্রথম পাঁচ ম্যাচেই গোলের বিরল কীর্তি
এক বিশ্বকাপে দেশের প্রথম পাঁচ ম্যাচেই গোল করা মাত্র ষষ্ঠ ফুটবলার মেসি। এর আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন জুস্ত ফঁতেন, জাইরজিনিও, জার্ড মুলার, রিভালদো ও হামেস রদ্রিগেস।
পেনাল্টি মিসের অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড
ম্যাচের ২১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন মেসি। বিশ্বকাপের এক আসরে টাইব্রেকার বাদ দিয়ে দুটি পেনাল্টি মিস করা প্রথম আর্জেন্টাইন ফুটবলারও তিনি। বিশ্বকাপে নেওয়া আটটি পেনাল্টির মধ্যে চারটিতে গোল করেছেন তিনি।
মারাদোনার পাশে মেসি
বিশ্বকাপের এক ম্যাচে গোল করার পাশাপাশি পাঁচটির বেশি সফল ড্রিবল এবং ওপেন প্লে থেকে পাঁচটির বেশি সুযোগ সৃষ্টি করা ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার মেসি। এর আগে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে এই কীর্তি গড়েছিলেন দিয়েগো মারাদোনা।
রেকর্ড ছুঁয়ে, রেকর্ড ভেঙে
এই বিশ্বকাপে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট। এতে তিনি কিলিয়ান এমবাপে ও আর্লিং হলান্ডকে ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠেছেন। একই সঙ্গে ১৯৩০ বিশ্বকাপে গিয়ের্মো স্তাবিলের এক আসরে আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ আট গোলের রেকর্ডেও ভাগ বসিয়েছেন।
বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে সাত ম্যাচে গোল করে যৌথভাবে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় উঠে এসেছেন মেসি। নকআউটে এখন তাঁর অবদান ১৪ গোলে-সাতটি গোল ও সাতটি অ্যাসিস্ট। গত ৬০ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি যৌথভাবে সর্বোচ্চ।
অ্যাসিস্টে একক শীর্ষে
বিশ্বকাপে মেসির অ্যাসিস্টসংখ্যা এখন নয়, যা ১৯৬৬ সাল থেকে সংরক্ষিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী সর্বোচ্চ। এতদিন তিনি দিয়েগো মারাদোনার সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন।
টানা গোল ও অপরাজিত থাকার রেকর্ড
দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে টানা নয় ম্যাচে গোল করে নিজের রেকর্ড আরো সমৃদ্ধ করেছেন মেসি। অন্যদিকে বিশ্বকাপে টানা ১১ ম্যাচ অপরাজিত থেকে নিজেদের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক গড়েছে আর্জেন্টিনা। একই সঙ্গে দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে টানা ১১ ম্যাচে একাধিক গোল করার কীর্তিও স্পর্শ করেছে তারা।
আরো কিছু উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান
* মিসরের বিপক্ষে ছয়টি গোলের সুযোগ তৈরি করেন মেসি, যা বিশ্বকাপে এক ম্যাচে তাঁর যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
* প্রতিপক্ষের পেনাল্টি এলাকার ভেতরে ১২ বার বল স্পর্শ করেন তিনি, যা বিশ্বকাপে এক ম্যাচে তাঁর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
* চলতি বিশ্বকাপে ৭৬ মিনিটের পর আর্জেন্টিনা করেছে আট গোল, যা এক আসরে যৌথভাবে সর্বোচ্চ।
* এনজো ফার্নান্দেসের জয়সূচক হেড ছিল চলতি বিশ্বকাপে হেড থেকে দশম গোল, যা এক আসরের নতুন রেকর্ড।
* চলতি বিশ্বকাপে কেবল পর্তুগাল ও আর্জেন্টিনার বিপক্ষেই দুটি করে গোল ভিডিও সহকারী রেফারির সিদ্ধান্তে বাতিল হয়েছে।
* গত ৬০ বছরে এক বিশ্বকাপে মিসরের হয়ে তিনটি গোলে অবদান রাখা মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার হয়েছেন মোস্তাফা জিকো। প্রথমজন মোহাম্মদ সালাহ।
* এক বিশ্বকাপে একাধিক গোল করা মিসরের মাত্র তৃতীয় ফুটবলারও এখন মোস্তাফা জিকো।
মিসরের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য এই জয় তাই শুধু একটি নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প নয়; এটি মেসি ও আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসে রেকর্ডে মোড়া আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়।
সানা/ডিসি/আপ্র/০৮/০৭/২০২৬