গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

শোষণ-নির্যাতন ও নিপীড়নে বন্দি প্রবাসী নারী গৃহকর্মীদের জীবন

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৩৭ পিএম, ০৮ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৬:১৫ এএম ২০২৬
শোষণ-নির্যাতন ও নিপীড়নে বন্দি প্রবাসী নারী গৃহকর্মীদের জীবন
ছবি

ছবি: সংগৃহীত

বিদেশে কাজ করতে যাওয়া হাজারো বাংলাদেশি নারীর চোখে একটি স্বপ্ন থাকে- পরিবারের আর্থিক সংকট কাটবে, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়বেন, নিজের জীবনেও আসবে সচ্ছলতা। কিন্তু ওই স্বপ্নের পথ বেশির ভাগ সময়ই হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা, নির্যাতন, শোষণ, এমনকি মৃত্যুর পথ। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে আমাদের সামনে এমন এক বাস্তবতা উঠে এসেছে, যা শুধু উদ্বেগজনক নয়; রাষ্ট্র ও সমাজ- উভয়ের জন্যই গভীর আত্মসমালোচনার বিষয়।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার বাংলাদেশি নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। একই সময়ে প্রায় ৮০০ নারীর মরদেহ ফিরেছে দেশে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই আত্মহত্যা বা স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হলেও পরিবারের অভিযোগ এবং মানবাধিকারকর্মীদের পর্যবেক্ষণ তথ্য বলছে, এসব ঘটনার অনেকগুলোরই নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আজও অজানাই রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের শুরু হয় বিদেশে যাওয়ার আগেই। অনেক নারী পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান কিংবা কর্মপরিবেশ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা ছাড়াই বিদেশে পাড়ি জমান। ফলে দালালচক্রের মিথ্যা আশ্বাস, চুক্তিভঙ্গ, পাসপোর্ট জব্দ করে রাখা, অতিরিক্ত শ্রম আদায়, বেতন আটকে দেওয়া এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই উঠে আসছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত গৃহকর্মীদের কাছ থেকে এমন অভিজ্ঞতার কথা বারবার শোনা যায়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রকৃত নির্যাতনের সংখ্যা হয়তো সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি। সামাজিক লজ্জা, ভয়, আইনি জটিলতা কিংবা পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক নারী নির্যাতনের কথা প্রকাশই করেন না। আবার দেশে ফেরার পরও অনেক অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয় না। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকে। অথচ নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা অসম্ভব নয়। বিদেশে যাওয়ার আগে দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা, আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং মানসিক প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগকারী এজেন্সিগুলোর কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি, বৈধ চুক্তি নিশ্চিত করা, বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর দ্রুত সহায়তা এবং জরুরি অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দেশে ফিরে আসা নির্যাতিত নারীদের জন্য পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং আইনি সহায়তাও সমানভাবে জরুরি।

শুধু সরকারের একক উদ্যোগে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, রিক্রুটিং এজেন্সি, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ দূতাবাস, মানবাধিকার সংস্থা ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশফেরত নির্যাতিত নারীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। কারণ নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পরও তাদের নতুন করে জীবন শুরু করার লড়াই কম কঠিন নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু গৃহকর্মী হিসেবে নয়, দক্ষ পেশায় নারীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, হসপিটালিটি কিংবা কারিগরি খাতে দক্ষ নারী কর্মী তৈরিতে বিনিয়োগ ভবিষ্যতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। বিদেশে কর্মরত নারীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু সেই অবদানের বিনিময়ে যদি একজন নারী নির্যাতিত হন, মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন কিংবা লাশ হয়ে দেশে ফেরেন, তবে তা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়- এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহিরও প্রশ্ন।

অভিবাসন থামানো সমাধান নয়। প্রয়োজন এমন একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক অভিবাসনব্যবস্থা, যেখানে একজন নারী বিদেশে যাওয়ার আগে যেমন সুরক্ষা পাবেন, তেমনি বিদেশে থাকাকালেও তার অধিকার নিশ্চিত হবে। নিরাপদ নারী অভিবাসন নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কারণ প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে লুকিয়ে থাকে একজন মানুষের জীবন, একটি পরিবারের স্বপ্ন এবং একটি জাতির দায়বদ্ধতা।

কেএমএএ/আপ্র/২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

শিশুর কাল্পনিক বন্ধু যেভাবে বিকাশে ভূমিকা রাখে
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশুর কাল্পনিক বন্ধু যেভাবে বিকাশে ভূমিকা রাখে

শিশুরা কখনো এমন কারো সঙ্গে কথা বলে, যাকে পরিবারের অন্য কেউ দেখতে পায় না। কখনো কাল্পনিক বন্ধুর জন্য খ...

শিশুদের নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
২১ অক্টোবর ২০২৬

শিশুদের নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

আজকের শিশুই আগামীর দেশ ও জাতির প্রকৃত সম্পদ। তারাই মূলত দেশ ও জাতি গঠনের কারিগর। একটি শিশুর জন্মের স...

নারীসত্তার পবিত্রতা ও সৃষ্টির শক্তি উপলব্ধির সাধনাই কুমারীপূজা
২১ অক্টোবর ২০২৬

নারীসত্তার পবিত্রতা ও সৃষ্টির শক্তি উপলব্ধির সাধনাই কুমারীপূজা

মাতৃভাব মানবহৃদয়ের অন্যতম পবিত্র অনুভূতি। এই ভাবের মধ্যেই নিহিত রয়েছে স্নেহ, মমতা, শ্রদ্ধা ও শুদ্ধতা...

ডিগ্রিধারী বৃদ্ধিতেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারী কম
২১ অক্টোবর ২০২৬

ডিগ্রিধারী বৃদ্ধিতেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারী কম

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সাম্প্রতিক ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬’ বাংলাদেশের উন্নয়...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 16 ঘন্টা আগে