গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

মেনু

শিশুর হাতে শিশুকে মারধর সামাজিক বিবেকে চপেটাঘাত

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৩৮ পিএম, ০৮ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২০:১৩ এএম ২০২৬
শিশুর হাতে শিশুকে মারধর সামাজিক বিবেকে চপেটাঘাত
ছবি

ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি ভারতের একটি প্রি-স্কুলে ঘটে যাওয়া এক ভয়ংকর ঘটনা আমাদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। এই নৃশংস ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; আমাদের সামষ্টিক বিবেকের ওপর এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত। একটি সুরক্ষিত আশ্রয়ে- যেখানে শিশুরা নিরাপদ থাকার কথা, সেখানে দুটো শিশু মিলে অন্য একটি শিশুকে টানা বিশ মিনিট ধরে মারধর করল। অথচ তা দেখার বা থামানোর মতো কেউ ছিল না! ওই প্রতিষ্ঠানের এই চরম গাফিলতি ও উদাসীনতার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ হয়তো নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে- এ নির্মমতা শুধুই একটি অব্যবস্থার গল্প, নাকি আমাদের চেনা সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক কুৎসিত ও ক্ষতবিক্ষত বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ?

মনোবিজ্ঞানীরা বারবার মনে করিয়ে দেন, শিশুরা জন্মগতভাবে সহিংস হয় না। তারা এক বুক নিষ্পাপ সারল্য আর অনুকরণ করার এক অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে পৃথিবীতে আসে। তারা আমাদের ঠোঁট দেখে কথা শেখে, হাত ধরে হাঁটা শেখে, চোখ দেখে হাসা বা ভালোবাসা শেখে। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তারা আঘাত করাও শেখে আমাদেরই দেখে। আজ বুক ঠুকে এই নির্মম সত্যটা স্বীকার করার সময় এসেছে- আমরা আমাদের সন্তানদের এমন এক সমাজ উপহার দিচ্ছি, যেখানে অবোধ মনগুলো চারপাশ থেকে অহিংসার বদলে শুধু হিংসা আর আগ্রাসনের বিষবাষ্প শুষে নিচ্ছে। একবার ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখুন, আজ আমাদের সন্তানরা চোখ মেললেই চারপাশে ঠিক কী দেখতে পাচ্ছে? টেলিভিশনের পর্দা খুললেই পলিটিক্যাল কাদা ছোড়াছুড়ি, মতের অমিল মানেই ভাঙচুর আর পেশিশক্তি প্রদর্শন। উত্তপ্ত বিতর্কের নামে চলে চিৎকার-চেঁচামেচি। ঘরের বাইরে বেরোলে রাস্তার আইনহীনতা আরও স্পষ্ট; ট্রাফিকের সামান্য ভুল বোঝাবুঝি কিংবা রিকশায় একটু ধাক্কা লাগা- ব্যস, মুহূর্তের মধ্যে ভদ্রলোকি মুখোশ খসে পড়ে শুরু হয়ে যায় হাতাহাতি, লাথি, রড উঁচিয়ে তাড়া করা।

ভিউ বাণিজ্যের কল্যাণে সেসব সহিংস ঘটনা পৌঁছে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। ভাষার সহিংসতা আজ এতটাই স্বাভাবিক যে, অন্যকে কদর্যভাবে অপমান করাকেই মানুষ নিজের ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ ভাবছে। একটি শিশু হয়তো এই কঠিন শব্দগুলোর রাজনৈতিক বা সামাজিক অর্থ বোঝে না, কিন্তু আচরণগুলো তার নরম মগজে খুব ভালো করেই গেঁথে রাখে। শিশু প্রথমে নির্দেশ নয়, আচরণ অনুসরণ করে। আপনি তাকে মুখে হাজারবার বলুন, ‘কারও গায়ে হাত তুলতে নেই।’ কিন্তু সে যদি প্রতিদিন দেখে প্রতিটি সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হচ্ছে গলার জোরে, ধাক্কায় আর থাপ্পড়ে। তবে তার মস্তিষ্কে একটি সরল সমীকরণ তৈরি হয়, ‘রাগ হলে বা জিততে হলে আঘাত করতে হয়।’ অনেক বাবা-মা সন্তানের সামনে একে অপরকে অপমান করেন, কখনও কখনও শারীরিক নির্যাতনও করেন। আবার সন্তানের ভুল হলে তাকেও মারধর করেন। এরপর সেই একই শিশুকে শেখান, ‘বন্ধুকে মারবে না।’ শিশুর কাছে এই দ্বৈত বার্তা মারাত্মক বিভ্রান্তিকর। সে ভাবে, বড়রা যদি রাগের সময় মারতে পারে, তাহলে আমি পারব না কেন?

বাইরের সমাজকে না হয় বাদই দিলাম, আমাদের চারদিকের আধুনিক গৃহকোণের ছবিটাই বা কতটা স্বস্তির? আজকের শৈশব ভীষণ একাকী। যৌথ পরিবার ভেঙে তৈরি হওয়া করপোরেট অণু পরিবারের কর্মব্যস্ত বাবা-মা সন্তানকে দামি খেলনা বা গ্যাজেট দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু দিতে পারছেন না ‘কোয়ালিটি টাইম’। পড়াশোনা আর ক্যারিয়ারের ইঁদুরদৌড়ে ‘তোমাকে প্রথম হতেই হবে’- এই লাগাতার চাপ শিশুর মনে এক ধরনের চাপা হতাশার জন্ম দেয়। সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যখন কোনো স্বাভাবিক নিকাশ খুঁজে পায় না, তখন তা প্রকাশ পায় অন্য কোনো দুর্বল শিশুর ওপর অত্যাচার করে। খেলার মাঠহীন এই একাকী শৈশবের বড় শিক্ষক এখন ডিজিটাল দুনিয়া। পাবজি, ফ্রি ফায়ার বা এই জাতীয় গেমিং কনসোলের মূল থিমটাই হলো- ‘কাউকে না মারলে তুমি নিজে বাঁচবে না।’

সোশ্যাল মিডিয়ার রিলসেও প্র্যাঙ্কের নামে অন্যকে হেনস্তা করাকে ‘কুল’ বা ‘ট্রেন্ডি’ বলে চালানো হচ্ছে। ফলে অবোধ শিশুমন মারাত্মকভাবে সংবেদনহীন হয়ে পড়ছে। অন্যের কষ্ট বা কান্না দেখে যে মায়া জাগ্রত হওয়ার কথা, সেই মানবিক গুণটাই লোপ পাচ্ছে। বিশ মিনিট ধরে একটা সমবয়সী শিশুকে মারার পরও ওই দুই শিশুর হাত কাঁপেনি, কারণ তাদের অবচেতন মন হয়তো ওটাকে কোনো ভিডিও গেমের টাস্ক বা সোশ্যাল মিডিয়ার মজার কনটেন্ট ভেবে বসেছিল!

আমরা প্রায়ই আক্ষেপ করি, ‘এখনকার বাচ্চারা বড় আক্রমণাত্মক।’ কিন্তু এই বাচ্চাদের পৃথিবীটা তৈরি করেছে কারা? আমরাই তো এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছি যেখানে ধৈর্যের চেয়ে উত্তেজনা বেশি দৃশ্যমান, যুক্তির চেয়ে শক্তির প্রদর্শন বেশি জনপ্রিয়, আর সংলাপের চেয়ে সংঘর্ষ বেশি আলোচিত। শিশুকে অহিংস করতে শেখানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তার চারপাশকে অহিংস করা। ঘরে নিজেদের রাগ ও ভাষা নিয়ন্ত্রণ করুন। কোনো বিষয়ে দ্বিমত হলে তা শান্তভাবে আলোচনা করে মেটানোর অভ্যাস করুন। সন্তানকে নিজের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে শেখান। যে শিশু বলতে পারে না, ‘তোমার কথায় আমার খারাপ লেগেছে’, সে-ই ঠেলে দেয় বা চড় মারে। সন্তান ইন্টারনেটে কী দেখছে, তার ওপর কড়া নজর রাখুন। হিংস্র গেমের বদলে তাদের সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখুন। ছোটবেলা থেকেই শেখান যে, অন্যের কষ্ট অনুভব করা দুর্বলতা নয়, শক্তির লক্ষণ।

ভারতের ওই প্রি-স্কুলের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু আদালত হয়তো প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণ করবে, আমাদের সমাজের অন্তহীন দায়ের বিচার করবে কে? যে দুটি শিশু আরেকটি শিশুকে মারছিল, তারা কি জন্ম থেকে নিষ্ঠুর ছিল? নাকি তারা প্রতিদিন একটু একটু করে আমাদেরই পৃথিবী থেকে শিখেছে- শক্তি মানেই জয়? আমরা কেমন পৃথিবী রেখে যেতে চাই, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই। শিশুর হাতে ওঠা প্রথম আঘাতের জন্য শুধু সেই ছোট্ট হাতটি দায়ী নয়; দায়ী সেই সমাজও- যে সমাজ প্রতিদিন তাকে শিখিয়েছে, মানুষকে বোঝানোর চেয়ে মানুষকে আঘাত করা অনেক সহজ। তাই সময় এসেছে শিশুদের বদলানোর আগে আয়নায় নিজেদের মুখ দেখার। কারণ শিশুর হৃদয়ে যদি ভালোবাসার বদলে সহিংসতার বীজ বপন করি, তাহলে একদিন ওই বিষাক্ত ফসল আমাদেরই ঘরে ফিরে আসবে।

কেএমএএ/আপ্র/২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

নারীর কাছে প্রেমিক পুরুষ আজও অনিরাপদ ও বিশ্বাসঘাতক
০৮ জুলাই ২০২৬

নারীর কাছে প্রেমিক পুরুষ আজও অনিরাপদ ও বিশ্বাসঘাতক

বাঙালি জীবনে এক সময় প্রেমিক পুরুষের প্রতিচ্ছবি ছিল শরৎচন্দ্রের দেবদাস।  শুধু প্রেমে ব্যর্থই নয়,...

শোষণ-নির্যাতন ও নিপীড়নে বন্দি প্রবাসী নারী গৃহকর্মীদের জীবন
০৮ জুলাই ২০২৬

শোষণ-নির্যাতন ও নিপীড়নে বন্দি প্রবাসী নারী গৃহকর্মীদের জীবন

বিদেশে কাজ করতে যাওয়া হাজারো বাংলাদেশি নারীর চোখে একটি স্বপ্ন থাকে- পরিবারের আর্থিক সংকট কাটবে, সন্ত...

আন্তর্জাতিক শেফ প্রতিযোগিতায় সেরা পাঁচে মাদিহা
০৮ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক শেফ প্রতিযোগিতায় সেরা পাঁচে মাদিহা

আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ ‘ফেভারিট শেফ ২০২৬’ প্রতিযোগিতার সেরা পাঁচ প্রতিযোগীর তালিকায় জায়গা করে নিয়ে...

বিশ্বকাপে গ্যালারিতে শিশুদের কানে হেডফোনের উপকারিতা
০৮ জুলাই ২০২৬

বিশ্বকাপে গ্যালারিতে শিশুদের কানে হেডফোনের উপকারিতা

ফুটবল বিশ্বকাপের মাঠে গিয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হচ্ছেন বহু দর্শক। কারও কারও সঙ্গে থাকছে শিশুও। বয়স বেশ কম...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, ন্যায়বিচারই অগ্রাধিকার

প্রতিশোধপরায়ণ বা প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি। আপনি কি মনে করেন, মাননীয় হুইপের এই বক্তব্য মোতাবেক সরকার পরিচালিত হচ্ছে বা হবে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে