অপেক্ষাটা ছিল দীর্ঘ ৯২ বছরের। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম আরব ও আফ্রিকান দেশ হিসেবে ১৯৩৪ সালে বিশ্বমঞ্চে পা রেখেছিল মিসর। কিন্তু একের পর এক আসর পেরিয়ে গেলেও অধরাই ছিল জয়ের স্বাদ। অবশেষে প্রায় এক শতাব্দীর সেই আক্ষেপ ঘুচল ভ্যানকুভারে। পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম জয়ের উল্লাসে ভাসল মোহাম্মদ সালাহর মিসর।
বিশ্বকাপের ‘জি’ গ্রুপের ম্যাচে জয় তুলে নিয়ে দুই ম্যাচে চার পয়েন্ট অর্জন করেছে মিসর। এই জয়ে গ্রুপের শীর্ষেও উঠে গেছে তারা। তবে শেষ বত্রিশে জায়গা এখনও নিশ্চিত হয়নি। আগামী শুক্রবার সিয়াটলে ইরানের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে অন্তত ড্র করতে পারলেই নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত হবে ‘ফারাও’দের।
ভ্যানকুভারের মাঠে ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল দুই দলের প্রাণবন্ত লড়াই। গ্যালারিজুড়ে ছিল মিসরীয় সমর্থকদের উচ্ছ্বাস। তবে সেই উচ্ছ্বাসে প্রথম ধাক্কা আসে ১৫তম মিনিটে। টিম পেইনের কর্নার থেকে দারুণ এক হেডে নিউজিল্যান্ডকে এগিয়ে দেন ফিন সারম্যান। রক্ষণভাগের ভুলে প্রায় অরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোল করে দলকে স্বপ্নের সূচনা এনে দেন তিনি।
গোল হজমের পর মিসর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালায়। ওমর মারমুশ, মোস্তফা জিকো ও মোহাম্মদ সালাহ বারবার আক্রমণে উঠে এলেও প্রথমার্ধে সমতা ফেরানো সম্ভব হয়নি। বরং নিউজিল্যান্ডও কয়েকটি বিপজ্জনক আক্রমণ করে ব্যবধান বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল।
বিরতির পর যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মিসরকে দেখা যায়। আক্রমণের তীব্রতা বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধে চেপে ধরে তারা। সেই চাপের ফল আসে ৫৮তম মিনিটে। মোহামেদ হেনির নিখুঁত ক্রস থেকে জোরালো হেডে সমতা ফেরান মোস্তফা জিকো। গোলটি মিসরের খেলোয়াড়দের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা এনে দেয়।
সমতায় ফেরার মাত্র নয় মিনিট পরই আসে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত। ডান প্রান্ত দিয়ে এগিয়ে এসে জিকোর সঙ্গে চমৎকার বোঝাপড়ায় আক্রমণ সাজান মোহাম্মদ সালাহ। জিকোর ব্যাকহিল পাস থেকে দৃষ্টিনন্দন শটে বল জালে জড়িয়ে মিসরকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন অধিনায়ক। বিশ্বকাপে নিজের তৃতীয় গোলের পাশাপাশি দেশের ফুটবল ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের জন্ম দেন তিনি।
গোলের পর আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত মিসর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। নিউজিল্যান্ডের রক্ষণভাগ তখন দিশেহারা। ৮২তম মিনিটে সালাহর কর্নার থেকে নিচু হয়ে দারুণ এক ডাইভিং হেডে ব্যবধান ৩-১ করেন ত্রেজেগে। সেই গোলেই কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায় মিসরের বহু প্রতীক্ষিত জয়।
ম্যাচে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে জয়ের নায়ক ছিলেন সালাহ। পুরো ম্যাচজুড়ে তাঁর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিবার বল স্পর্শে গ্যালারিতে উচ্ছ্বাসের ঢেউ উঠেছে। জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হোসাম হাসানের রেকর্ড স্পর্শ করতে এখন তাঁর প্রয়োজন আর মাত্র একটি গোল।
এই জয় মিসরের জন্য আরেকটি পরিসংখ্যানগত অর্জনেরও সাক্ষী হয়ে থাকল। ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপে অভিষেক ম্যাচে হাঙ্গেরির বিপক্ষে দুই গোল করেছিল দলটি। এরপর দীর্ঘ সময় বিশ্বকাপে এক ম্যাচে একাধিক গোলের দেখা পায়নি তারা। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিন গোল করে সেই অপেক্ষারও অবসান ঘটাল মিসর।
প্রথম ম্যাচে বেলজিয়ামের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছিল মিসর। অন্যদিকে ইরানের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করা নিউজিল্যান্ডের জন্য এই হার বড় ধাক্কা হলেও নকআউট পর্বে ওঠার সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। শেষ ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয় পেলেই নতুন হিসাব খুলতে পারে তাদের সামনে।
তবে দিনের আলোচনার কেন্দ্রে নিঃসন্দেহে মিসর। ১৯৩৪ সালে শুরু হওয়া বিশ্বকাপ যাত্রার পর ৯২ বছর অপেক্ষা করে পাওয়া এই জয় শুধু তিন পয়েন্ট নয়, মিসরীয় ফুটবলের ইতিহাসে এক গৌরবময় মাইলফলক হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সানা/আপ্র/২২/৬/২০২৬