ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ককে আরো গভীর করার তৎপরতা নতুন গতি পেয়েছে। নয়াদিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গরের সঙ্গে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির ধারাবাহিক বৈঠক, পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং পাকিস্তান-সৌদি আরব-তুরস্কের নতুন প্রতিরক্ষা সমঝোতার প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এসব তৎপরতা শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও বৃহত্তর এশীয় নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তিত সমীকরণও যুক্ত।
গত মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) নয়াদিল্লিতে অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠকের পর সার্জিও গর বৈঠকটিকে ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের কৌশলগত সহযোগিতা আরো জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের অভিন্ন লক্ষ্য রয়েছে এবং তাদের পারস্পরিক সম্পৃক্ততা ক্রমাগত বাড়ছে বলেও জানান তিনি।
এর এক দিন আগে সার্জিও গর ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির সঙ্গে বৈঠক করেন। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছেন, এসব বৈঠকে দুই দেশের সমন্বিত বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, জরুরি খনিজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো জোরদারের বিষয়ে উভয় পক্ষের অঙ্গীকারের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করার কয়েক দিনের মধ্যেই নয়াদিল্লিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ভারতের শীর্ষ নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক বৈঠক হলো। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই ওই ফোনালাপে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বৃহত্তর কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক সম্প্রতি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, তিন দেশের কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা। এর আগে ২০২৫ সালে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পৃথক কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছিল।
এই নতুন সমীকরণকে সরাসরি কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক জোট হিসেবে দেখার চেয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত। তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা কাঠামো এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি-এই তিনের ঘনিষ্ঠতা পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক হিসাবকে অবশ্যই প্রভাবিত করবে। একই সঙ্গে ভারতীয় স্বার্থের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কও এই সমীকরণকে আরো জটিল করে তুলছে।
ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো-একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরো গভীর করা, অন্যদিকে সৌদি আরব, তুরস্কসহ পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে নিজস্ব সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা। আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভারত ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে চীন মোকাবিলা, ভারত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, জরুরি খনিজ এবং জ্বালানি নিরাপত্তার বৃহত্তর হিসাবেও।
তবে এই কূটনৈতিক তৎপরতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ায় নিরাপত্তা কাঠামো দ্রুত বহুমুখী হয়ে উঠছে। একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরতার বদলে দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছে। ফলে ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সমঝোতা, ভারসাম্য ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন-তিনটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের গভীরতা, পাকিস্তান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা বাংলাদেশের বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, প্রবাসী শ্রমবাজার ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ঢাকার প্রয়োজন কোনো পক্ষের বলয়ে আবদ্ধ না হয়ে জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি জোরদার করা।
নয়াদিল্লিতে সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো সেই পরিবর্তনশীল বিশ্বেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত-এশিয়ার নিরাপত্তা ও কূটনীতির পুরোনো সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তন বুঝে আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রয়োজন।
সানা/আপ্র/১৩/৮/২০২৬