সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে বাংলাদেশকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সরকারি ক্রয়চুক্তির মৌলিক তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা, বাজেটের নথি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রস্তুত করা এবং দেশের সর্বোচ্চ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়কে কার্যকর স্বাধীনতা দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত ২০২৬ সালের আর্থিক স্বচ্ছতা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, নিরীক্ষা এবং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক মূল্যায়ন করে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। গত ১১ আগস্ট প্রকাশিত বার্ষিক এই প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৩৯টি সরকার ও একটি সত্তার আর্থিক স্বচ্ছতা পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে ৭৩টি দেশ ন্যূনতম আর্থিক স্বচ্ছতার মানদণ্ড পূরণ করেছে। ৬৭টি দেশ তা পূরণে ব্যর্থ হলেও ১৪টি দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক অগ্রগতিও স্বীকার করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে সময়মতো বছরের শেষের আর্থিক বিবরণী প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশ আর্থিক স্বচ্ছতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার আগের সরকারের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামো অনুসরণ করার পাশাপাশি স্বচ্ছতা বাড়াতে কিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ নিয়েছে।
সরকারের নির্বাহী বাজেট প্রস্তাব ও অনুমোদিত বাজেট অনলাইনে প্রকাশের বিষয়টিও ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এসব নথি পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, প্রতিবেদনের মূল্যায়নে বাজেটের তথ্য সাধারণত নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের ঋণসংক্রান্ত তথ্য জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে আয়সহ সরকারের সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের একটি মোটামুটি স্পষ্ট চিত্র বাজেটে পাওয়া যায় বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে ঘাটতির জায়গাগুলোও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাজেটে নির্বাহী কার্যালয়গুলোর পরিচালন ব্যয়ের খাতভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ হিসাব না থাকা এবং সরকারের সব আয়-ব্যয়ের একটি সম্পূর্ণ চিত্র না পাওয়াকে দুর্বলতা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এসেছে দেশের সর্বোচ্চ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় নিয়ে। মার্কিন প্রতিবেদনের মতে, প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে সরকারি হিসাব কার্যকরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থেকে যাচ্ছে।
সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা চালু থাকার বিষয়টিও প্রতিবেদনে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে এই ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সুযোগ আরো বিস্তৃত করা এবং সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য সহজে জনসাধারণের নাগালে আনার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র।
স্বচ্ছতা বাড়াতে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণসংক্রান্ত চুক্তির মৌলিক তথ্য প্রকাশেরও সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি অনুমোদিত বাজেটের সঙ্গে প্রকৃত আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা, সর্বোচ্চ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও কার্যকর স্বায়ত্তশাসন দেওয়া এবং কোনো ধরনের অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই সময়মতো পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক নিরীক্ষা সম্পন্ন করার সক্ষমতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা কেবল আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, বিনিয়োগকারীর আস্থা এবং জনগণের করের অর্থের সঠিক ব্যবহারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সরকারি ক্রয়চুক্তি ও ব্যয়ের তথ্য যত বেশি উন্মুক্ত হবে, অনিয়ম ও অপচয়ের সুযোগ তত কমবে। একই সঙ্গে স্বাধীন ও শক্তিশালী নিরীক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের জবাবদিহিও আরো কার্যকর হবে।
সানা/আপ্র/১৩/৮/২০২৬