কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ‘রাজনৈতিক জোকার’ আখ্যা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের সমাপনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বুধবার (১২ আগস্ট) সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকাকালে নিজেদের ‘প্রথম শ্রেণির নাগরিক’ এবং অন্যদের ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ মনে করত-এমন বক্তব্য তিনি যুক্তিতর্কে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর দাবি, দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য রাজনৈতিক নেতার দায়িত্বশীল বক্তব্যের পর্যায়ে ছিল না।
তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদেরের বিভিন্ন বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ত এবং সেগুলো নিয়ে নানা ধরনের প্রচার হতো। তাঁর ভাষায়, এমন একজন ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক করার কারণেই দলটি রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।
প্রধান কৌঁসুলির দাবি, ওবায়দুল কাদেরের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের পর আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা সহিংসতায় জড়িত হন। আন্দোলন দমনে ‘দেখামাত্র গুলি’ করার মতো নির্দেশনার কথাও ওবায়দুল কাদের বিভিন্ন সময়ে বলেছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ বুধবার ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মামলায় প্রসিকিউশনের সমাপনী যুক্তিতর্ক শেষ হয়। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। তাঁরা সবাই পলাতক অবস্থায় বিচার মোকাবিলা করছেন।
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে মামলার অন্য ছয় আসামিও দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের আড়ালে তাঁরা দুর্বৃত্তপরায়ণতা, দুর্নীতি ও দুষ্কর্মে জড়িত ছিলেন।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, আসামিদের ব্যক্তিগত দায়ের পাশাপাশি তাঁদের ওপর ‘সুপিরিয়র কমান্ড’ বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ও রয়েছে। এ দুই ধরনের দায়ের ভিত্তিতে তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হয়েছে।
মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে মোট ২৯ জনের সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানান প্রধান কৌঁসুলি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহিন সরকার ৫ জুন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনা করে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন। নিহত শরীফ ওসমান হাদির বক্তব্যও আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া নিহতদের স্বজন ও বিশেষজ্ঞদের জবানবন্দি, ভিডিওচিত্র, কলের বিস্তারিত রেকর্ড এবং ফরেনসিক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, এসব সাক্ষ্য ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁরা মামলাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির পাশাপাশি তাঁদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশও চেয়েছেন।
তিনি জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও জরিমানার বিধান থাকলেও তা কার্যকরের প্রক্রিয়া ট্রাইব্যুনালের কার্যপ্রণালিবিধিতে স্পষ্ট নয়। এ কারণে প্রচলিত আইনের ‘পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট’ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারার বিধান অনুসরণ করে জরিমানা আদায় ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আবেদন করা হয়েছে।
গত ৪ আগস্ট এ মামলায় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রথম দিন মামলার সামগ্রিক পটভূমি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। এরপর পাঁচ কার্যদিবসে প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। প্রসিকিউশনের সমাপনী যুক্তি শেষ হওয়ার পর পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা তাঁদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেছেন।
সানা/আপ্র/১৩/৮/২০২৬