মানবপাচারের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ১০টি দেশে গত ২১ মাসে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ৪১ হাজার ২৩১ জন বাংলাদেশি গেছেন। এসব দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছেন কম্বোডিয়ায়। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে মানবপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের অগ্রগতির পাশাপাশি গুরুতর সীমাবদ্ধতার চিত্র উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সর্বশেষ ‘ট্রাফিকিং ইন পারসন্স’ (টিআইপি) প্রতিবেদনে।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবপাচার নির্মূলে বাংলাদেশ সরকার আগের মূল্যায়নের তুলনায় সামগ্রিক প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে। তবে দেশটি এখনো আন্তর্জাতিক ন্যূনতম মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। এ কারণে বাংলাদেশকে দ্বিতীয় স্তর বা ‘টিয়ার ২’-এ রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানবপাচারের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা তৃতীয় স্তর বা ‘টিয়ার ৩’-এর ১০টি দেশে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪১ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গেছেন। দেশগুলো হলো কম্বোডিয়া, রাশিয়া, লাওস, কঙ্গো, বেলারুশ, সুদান, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, লিবিয়া ও ইয়েমেন।
আন্তর্জাতিকভাবে মানবপাচার প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং অপরাধীদের বিচারের অগ্রগতি মূল্যায়নে টিআইপি প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। এর তৃতীয় স্তরে থাকা দেশগুলোর সরকার মানবপাচার নির্মূলে ন্যূনতম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ এবং সে জন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপও নেয় না বলে মূল্যায়ন করা হয়।
মানবপাচারের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে এত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর তথ্য তাঁদের নিরাপত্তা, নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সরকারের ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কর্মী যাওয়ার তালিকায় শীর্ষে কম্বোডিয়া
বিএমইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২১ মাসে মানবপাচারের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ১০ দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কর্মী গেছেন কম্বোডিয়ায়, ১৫ হাজার ৯৬৩ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে রাশিয়া, যেখানে গেছেন ৭ হাজার ৭৫২ জন। লাওসে গেছেন ৭ হাজার ৫৩২ জন।
এ ছাড়া কঙ্গোয় ৫ হাজার ৪৩৮ জন, বেলারুশে ৩ হাজার ৪৮৪ জন, সুদানে ৪২১ জন, সোমালিয়ায় ৩৪৩ জন, লিবিয়ায় ১৭২ জন, দক্ষিণ সুদানে ৬৯ জন এবং ইয়েমেনে ৫৭ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন।
প্রচেষ্টা বাড়লেও ঘাটতি রয়ে গেছে
টিআইপি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মানবপাচারবিরোধী কার্যক্রমে কয়েকটি অগ্রগতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মানবপাচার প্রতিরোধে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে ‘মানবপাচার ও অভিবাসী পাচার প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ ২০২৬’ জারি, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া বাড়ানো, মানবপাচারের অপরাধ এবং ভুক্তভোগী শনাক্তকরণের নির্দেশিকা হালনাগাদ করা। এ ছাড়া ভুক্তভোগীদের সুরক্ষাসেবায় স্থানান্তরের সমন্বয় ও গতি বাড়াতে ডিজিটাল জাতীয় রেফারেল ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও নেওয়া হয়েছে।
অভিবাসী শ্রমিকদের মানবপাচারের ঝুঁকি কমাতে তাঁদের সুরক্ষা জোরদারের উদ্যোগও প্রতিবেদনে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরকার এখনো ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের তুলনায় সরকার কমসংখ্যক মানবপাচারকারীকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। দেশের অভ্যন্তরে মানবপাচার দমনে পর্যাপ্ত পদক্ষেপেরও ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে পাচারের শিকার কমসংখ্যক মানুষকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমও পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এসব ঘাটতি রয়েছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, শ্রমিক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মীদের কাছ থেকে নিয়োগ ফি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে অনেক অভিবাসী শ্রমিক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন এবং মানবপাচারের ঝুঁকিতে পড়ছেন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়াসহ বিভিন্ন গন্তব্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং দূতাবাসের মাধ্যমে কূটনৈতিক সুরক্ষার পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাবও চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব সমস্যা মোকাবিলায় অবৈধ নিয়োগ ফি বাতিল, জনশক্তি নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্তকরণ, পর্যাপ্ত আইনি ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং মানবপাচারবিষয়ক ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
কম্বোডিয়া ও রাশিয়ার অভিজ্ঞতায় উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে কম্বোডিয়ার সাইবার প্রতারণাকেন্দ্রগুলোতে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের নিয়ে যাওয়ার পর আটকে রেখে সাইবার অপরাধে বাধ্য করা, নির্যাতন এবং মানবপাচারের একাধিক ঘটনা দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়ে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর ঘটনাও সামনে এসেছে।
এমন পরিস্থিতির পরও আন্তর্জাতিক সতর্কতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এসব দেশে কর্মী পাঠানো হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অভিবাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ব্যক্তিপর্যায়ে শিক্ষার্থী বা পর্যটক ভিসায় গমনে সরকারের সরাসরি নজরদারি কঠিন হলেও, বিএমইটি ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ক্লিয়ারেন্স নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দায় পুরোপুরি সরকারের। গুণগত সুরক্ষার চেয়ে কেবল সংখ্যা বাড়ানোর প্রবণতার কারণেই এমন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, “কম্বোডিয়া বা রাশিয়ার মত দেশে ভুক্তভোগী কর্মীরা প্রতারিত হলে বা অঙ্গহানির মত ঘটনার শিকার হলেও কর্তৃপক্ষ দায় রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। অথচ বিতর্কিত রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমোদন দেওয়া ও তাদের কার্যক্রম নজরদারির মূল দায়িত্ব বিএমইটির।”
তথ্য যাচাইয়ে গাফিলতির অভিযোগ তুলে আসিফ মুনীর বলেন, “যেসব দেশে বাংলাদেশ মিশন বা দূতাবাস নেই, সেসব দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি অনলাইন বা প্রবাসী বাংলাদেশীদের মাধ্যমে যাচাই না করে ঢালাওভাবে কর্মী ছাড়পত্র দেওয়া স্পষ্টত সরকারি গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার পরিচয়।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক ও বিএমইটির মহাপরিচালক জামিল আহমেদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁদের পাওয়া যায়নি।
কর্মী পাঠানোর পর তাঁদের খোঁজ রাখছে কে
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বিডিনিউজ জানিয়েছে, “স্রেফ কর্মী পাঠানোর পরিসংখ্যান বৃদ্ধিই রাষ্ট্রের সাফল্য হতে পারে না। একই সঙ্গে তাদের কর্ম পরিবেশ, চুক্তি অনুযায়ী বেতন নিশ্চিত হওয়া এবং সামগ্রিক নিরাপত্তার হিসাব রাখাও রাষ্ট্রের সমান দায়িত্ব।”
ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর পর তাঁদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে পাঁচটি বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
প্রথমত, এসব দেশে কর্মী পাঠানোর আগে মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম, প্রতারণা ও নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে দেশভিত্তিক কোনো সুনির্দিষ্ট সমীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, ভুয়া চাকরির প্রস্তাব ও প্রতারণা ঠেকাতে গন্তব্য দেশগুলোর নিয়োগকর্তা এবং কর্মপরিবেশ যাচাইয়ের কী ব্যবস্থা ছিল, তার ব্যাখ্যা দরকার।
তৃতীয়ত, পাঠানো ৪১ হাজার ২৩১ জনের মধ্যে কতজন চুক্তি অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন, কতজন শোষণ বা মানবপাচারের শিকার হয়েছেন এবং কতজনের হালনাগাদ তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে, তা জানাতে হবে।
চতুর্থত, বিপদে পড়া কর্মীদের দ্রুত উদ্ধার, আইনি সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয় এবং দেশে ফিরিয়ে আনতে কী ধরনের কূটনৈতিক ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে, তা স্পষ্ট করা জরুরি।
পঞ্চমত, কম্বোডিয়া ও রাশিয়ায় কর্মীদের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর সংশ্লিষ্ট জনশক্তি নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহি এবং তদারকি ব্যবস্থায় দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না, তারও ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
মানবপাচারের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর এই পরিসংখ্যান তাই শুধু বিদেশে কর্মসংস্থানের হিসাব নয়; বরং কর্মীদের নিরাপত্তা, নিয়োগপ্রক্রিয়ার জবাবদিহি এবং বিদেশে তাঁদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
সানা/আপ্র/১০/১০/২০২৬