নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বান ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল।
তিনি বলেছেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান অত্যন্ত সামান্য হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি নেপাল। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের দায় যাদের বেশি, সেই দেশগুলোর পাশাপাশি পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) এক সংবাদ সম্মেলনে শিশির খানাল বলেন, ‘আমি বিশ্বকে অনুরোধ জানাচ্ছি, তারা যেন জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে দেখে, যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে নেপাল ও দেশটির নাগরিকরা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৈশ্বিক প্রচেষ্টা আবশ্যক।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বসম্প্রদায়কে একযোগে এগিয়ে এসে হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
হিমালয় ঘিরে আঞ্চলিক সহযোগিতার তাগিদ
ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটানের মতো হিমালয়ঘেঁষা দেশগুলোর মধ্যে পরিবেশগত সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতেই পারে। কিন্তু এসব দেশের অস্তিত্ব একই হিমালয় অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে হিমালয়ের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা সবার অভিন্ন স্বার্থের বিষয়।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সাম্প্রতিক ভয়াবহ দুর্যোগের কারণ অনুসন্ধানের প্রসঙ্গে খানাল জানান, সরকার এ বিষয়ে আরও গবেষণা করার পরিকল্পনা করেছে। হিমালয় অঞ্চলে দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য চীনা গবেষকদের সঙ্গে ইতোমধ্যে একটি যৌথ ব্যবস্থাও চালু রয়েছে বলে জানান তিনি।
দুর্যোগের কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়
২৬ আগস্ট ভোতে কোশি নদী অববাহিকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নেপাল সরকারের ২৯ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, ওই দুর্যোগে ৬২৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রায় ২ হাজার ৪০০ মানুষ এখনো নিখোঁজ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমবাহ ও শিলাখণ্ড ধসে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি নদী ব্যবস্থায় নেমে এসে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। তবে ঠিক কী কারণে ওই ধসের সূত্রপাত হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয়ে হিমবাহ, তুষার ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির অস্থিতিশীলতা এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
শত শত কোটি মানুষের পানির ভরসা
হিমালয়ের হিমবাহ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নদ-নদীর অন্যতম প্রধান পানির উৎস। এই পানি কৃষি, পানীয় জল, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনসহ কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একদিকে ভবিষ্যতে পানির সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে, অন্যদিকে হিমবাহ ও পাহাড়ি হ্রদের অস্থিতিশীলতার কারণে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও বরফধসের ঝুঁকিও বাড়ছে। হিমালয় অঞ্চলের দ্রুত উষ্ণায়ন নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগও ক্রমেই বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় নেপালের বার্তা শুধু একটি দেশের দুর্যোগ মোকাবিলার আহ্বান নয়; এটি হিমালয় ও এর ওপর নির্ভরশীল সমগ্র অঞ্চলের পরিবেশগত নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
নেপালের বক্তব্য—যে দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী, সেই দেশই যদি তার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতিগুলোর শিকার হয়, তাহলে বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায্যতা, ক্ষয়ক্ষতির দায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
এ কারণেই হিমালয় রক্ষার প্রশ্নটি এখন আর শুধু নেপালের নয়। এটি ভারত, চীন, ভুটান, বাংলাদেশসহ হিমালয় ও এর নদী অববাহিকার সঙ্গে যুক্ত পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
সানা/আপ্র/৩০/৮/২০২৬