গুম বা জোরপূর্বক অন্তর্ধানকে বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, গুম শুধু একজন মানুষের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্ন, সাধ ও আকাঙ্ক্ষারও মৃত্যু ঘটে।
আজ রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে শনিবার (২৯ আগস্ট) দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মোস্তফা জুলফিকার হাসান এ তথ্য জানান।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুম বা অপহরণ শুধু একটি সংখ্যা নয় কিংবা একজন ব্যক্তির হারিয়ে যাওয়া নয়; বরং এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, সাধ ও আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু। এতে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ থমকে যায়। গুম হওয়া মানুষের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের দিন কাটে এমন এক অনিশ্চিত বাস্তবতায়, যেখানে কোনো সমাপ্তি নেই, এমনকি স্বাভাবিকভাবে শোক পালনের সুযোগও থাকে না।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব গুম হওয়া ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সহমর্মিতা জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিশেষ করে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে গুমের মতো অমানবিক ঘটনা ঘটে। অনেক সময় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সরকারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের নির্দয় ও নিষ্ঠুর পথ বেছে নেয়।
বাংলাদেশে গুমের ভয়াবহতা
বাংলাদেশের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের পতিত ও পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার দমনের জন্য গুম-অপহরণের অমানবিক পথ বেছে নিয়েছিল। গুম-অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর আটক রাখার জন্য গোপন বন্দিশালা তৈরি করা হয়েছিল, যেগুলো জনপরিসরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পায়।
প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে ওই সরকার বিভিন্ন সময়ে কমপক্ষে সাত শতাধিক মানুষকে গুম করেছে। তিনি এ ঘটনাকে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট চক্রের পতনের পর গুম হওয়া কয়েকজন সৌভাগ্যক্রমে ফিরে এসেছেন। তবে ইলিয়াস আলী কিংবা চৌধুরী আলমের মতো অসংখ্য মানুষের আজও কোনো খোঁজ মেলেনি।
গুমের বিচার ও নতুন আইনি কাঠামো
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। ভবিষ্যতে গুম বা জোরপূর্বক অন্তর্ধান বন্ধ করতে পৃথক আইনি কাঠামোও প্রণয়ন করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ উত্থাপিত হয়েছে। ২৭ আগস্ট উত্থাপিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
সরকার আশা করছে, বিলগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় আইনে পরিণত হলে ভবিষ্যতে কেউ গুম বা অপহরণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে না।
আন্তর্জাতিক আইনে গুম মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ
গুমের আন্তর্জাতিক আইনি অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সনদের ৭(২) অনুচ্ছেদে গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং এ ধরনের ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক গুম বা জোরপূর্বক অন্তর্ধানের বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত রাখতে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য—‘ভুক্তভোগী আগে, এখনই পদক্ষেপ’।
এই মনুষ্যত্বহীন অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে ঐক্য ও সংহতির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
সানা/আপ্র/৩০/৮/২০২৬