কিছু উপহারের দাম টাকায় মাপা যায় না। কোনো কোনো উপহারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু বছরের স্মৃতি, ভালোবাসা আর এমন এক মায়া—যা সময়ও মুছে ফেলতে পারে না।
প্রায় চার দশক আগে সিঙ্গাপুরের একটি ঘড়ির দোকানে দাঁড়িয়ে বড় ভাইয়ের চোখ আটকে গিয়েছিল একটি দামি ঘড়িতে। ঘড়িটি কেনার সামর্থ্য তখন ছিল না। শেষ পর্যন্ত অন্য একটি ঘড়ি কিনেই দোকান থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি। হয়তো সেদিনের সেই মুহূর্তটুকু তাঁর নিজেরই মনে ছিল না আর। কিন্তু পাশে থাকা ছোট ভাইয়ের মনে ঠিকই গেঁথে গিয়েছিল দৃশ্যটি।
তারপর পেরিয়ে গেছে প্রায় ৪০ বছর।
বড় ভাই ভুলে গেছেন, সময়ও এগিয়ে গেছে বহুদূর। কিন্তু ছোট ভাই ভুলে যাননি। সেই পুরোনো পছন্দ, সেই অপূর্ণ ইচ্ছা—সবই যেন যত্ন করে তুলে রেখেছিলেন হৃদয়ের এক কোণে। তাই একদিন হঠাৎ এসে বললেন, ‘ভাইয়া, তোমার হাতটা দাও।’
তারপর বড় ভাইয়ের হাতে পরিয়ে দিলেন একটি দামি ঘড়ি।
চিত্রনায়ক মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা আর তাঁর ছোট ভাই চিত্রনায়ক মাসুম পারভেজ রুবেলের গল্পটা যেন সিনেমারই কোনো আবেগঘন দৃশ্য। তবে এবার পর্দায় নয়, জীবনের বাস্তব মঞ্চে।
প্রায় ৪০ বছর আগে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে গিয়েছিলেন সোহেল রানা। সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই রুবেল ও পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন। চিকিৎসা শেষে চিকিৎসক জানালেন, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। স্বস্তি আর আনন্দ নিয়ে তাঁরা ফিরে গেলেন হোটেলে।
বিকেলে তিনজন বের হলেন ঘুরতে। একসময় ঢুকে পড়লেন একটি ঘড়ির দোকানে।
ঘড়ির প্রতি সোহেল রানার ভালোবাসা তখনও প্রবল। দেশের বাইরে গেলেই সুযোগ পেলে ঘড়ির দোকানে ঢুঁ মারা তাঁর অভ্যাস ছিল। ১৯৮৫ সালের সেই দিনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
প্রায় ৪০ বছর আগে বড় ভাই চিত্রনায়ক ও প্রযোজক মাসুদ পারভেজ সোহেল রানার ‘লড়াকু’ ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন ছোট ভাই রুবেল। ছবির পোস্টারটি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত
তাঁর হাতে তখন প্রায় ৩০ হাজার টাকা দামের একটি রাডো ঘড়ি। শোরুমে গিয়ে নতুন একটি দামি ঘড়ি কেনার ইচ্ছার কথা জানালেন। দোকানি তাঁকে দেখাল একটি পাতেক ফিলিপ ঘড়ি। দাম শুনে যেন থমকে গেলেন তিনি—প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা!
সেই সময়ের হিসাবে বিপুল অর্থ।
সোহেল রানা স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘ঘড়ির দোকানে গিয়ে বললাম, ভালো ঘড়ি দেখান। সেই সময় আমার হাতে ৩০ হাজার টাকা দামের সুন্দর একটা রাডো পরা ছিল। যত দূর মনে পড়ে, আমাকে দোকানি দেখিয়েছিল পাতেক ফিলিপ—ওই সময়ে ঘড়িটির দাম সাড়ে সাত লাখ টাকা চেয়েছিল। দাম শুনে আমি হতচকিত হয়ে পড়ি। তারপর বললাম, আরো কম দামের দেখান। তখন কমাতে কমাতে বুচারার ব্র্যান্ডের একটি ঘড়ি কিনেছিলাম। ওই সময়ে ঘড়িটির দাম ছিল ৫০ হাজার টাকা।’
ঘড়ি কিনে দোকান থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন ঠিকই। কিন্তু চোখ যেন বের হতে চাইছিল না সেই দামি ঘড়িটির দিক থেকে। বারবার তাকাচ্ছিলেন তিনি।
আর সেই তাকিয়ে থাকা চোখটি খেয়াল করেছিলেন ছোট ভাই রুবেল।
সেদিন হয়তো সোহেল রানা জানতেন না, তাঁর সেই নীরব আকাঙ্ক্ষার সাক্ষী হয়ে গেছেন ছোট ভাই। জানতেন না, কয়েক দশক পর সেই এক মুহূর্তই ফিরে আসবে অন্য এক রূপে।
সময়ের স্রোতে চলে গেছে প্রায় ৪০ বছর। সোহেল রানা ভুলে গেছেন সেই ঘটনা। কিন্তু রুবেল ভুলে যাননি।
সোহেল রানা বলেন, ‘বুচারার কিনলেও পাতেক ফিলিপ ব্র্যান্ডের ঘড়ি যে বারবার দেখছিলাম, এটা আমার ছোট ভাই খেয়াল করেছিল। আজ এত বছর পর সে শুধু আমার জন্য ঘড়ি কিনতে ব্যাংককে গেছে। আমি যে ঘড়িটা সেদিন দেখেছিলাম, ওটার দাম এখন কোটি ছাড়িয়েছে।’
চার দশক পর সেই পাতেক ফিলিপ কেনা হয়নি। হয়তো সেটি আর সম্ভবও নয়। কিন্তু বড় ভাইয়ের সেই পুরোনো ইচ্ছেটিকে অপূর্ণ থাকতে দিলেন না রুবেল।
ইউরোপিয়ান একটি দামি ব্র্যান্ডের সুন্দর ঘড়ি কিনে আনলেন বড় ভাইয়ের জন্য। বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকার উত্তরায় সোহেল রানার বাসায় গেলেন তিনি। কথাবার্তার একপর্যায়ে হঠাৎ বললেন, ‘ভাইয়া, তোমার হাতটা দাও।’
বড় ভাই হাত বাড়িয়ে দিলেন।
রুবেল একটি প্যাকেট খুললেন। তারপর ধীরে ধীরে ঘড়িটি বের করে বড় ভাইয়ের হাতে পরিয়ে দিলেন। আর বললেন, ‘পাতেক ফিলিপ তো দিতে পারলাম না, যেটা তোমার শখ ছিল—কিন্তু এটা দিলাম।’
কয়েকটি শব্দ। অথচ তার ভেতরে জমে ছিল প্রায় ৪০ বছরের ভালোবাসা।
ঘড়িটি হাতে পরিয়ে দেওয়ার পর বড় ভাই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। ছোট ভাইকে বুকে টেনে নিলেন সোহেল রানা। আবেগে ভিজে গেল মুহূর্তটি।
উপহারের দাম কত—সেটি তাঁর কাছে তখন আর কোনো প্রশ্নই নয়। বরং বড় ভাইয়ের বহু পুরোনো একটি ইচ্ছের কথা এত বছর পরও ছোট ভাই মনে রেখেছেন—এই ভালোবাসাই হয়ে উঠল সবচেয়ে দামি।
সংবাদমাধ্যমকে সোহেল রানা বলেন, ‘টাকা বিচার্য বিষয় না, ছোট ভাই যে বড় ভাইয়ের চাওয়ার কথা মনে রেখেছে—এটা অনেক বড় ব্যাপার। যে ঘড়িটা এনেছে, সেটাও কিন্তু ওর সাধ্যের চেয়ে অনেক ওপরে, ভাইয়ের জন্য এটা কিনে এনেছে—এই উপহারের সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর কোনো তুলনা চলে না।’
সোহেল রানার সংগ্রহে পছন্দের আরো অনেক ঘড়ি আছে। সময়ের সঙ্গে আরো ঘড়ি হয়তো তাঁর সংগ্রহে যোগ হবে। কিন্তু রুবেলের দেওয়া ঘড়িটির জায়গাটি আলাদা।
‘ভালোবাসার মূল্য কত’- ছবিতে সাড়া জাগানো অভিনয় করেছেন সোহেল রানা -ছবি সংগৃহীত
কারণ এটি শুধু একটি ঘড়ি নয়।
এর কাঁটায় কাঁটায় যেন আটকে আছে একটি পুরোনো বিকেল, সিঙ্গাপুরের একটি ঘড়ির দোকান, বড় ভাইয়ের মুগ্ধ চোখ আর ছোট ভাইয়ের নীরব স্মৃতি। চার দশক পেরিয়েও যে স্মৃতি মুছে যায়নি।
তাই সোহেল রানা বলছেন, ‘আমার অন্য ঘড়িও থাকবে—তবে ছোট ভাইয়ের এই উপহারের ঘড়িটা এখন আমার সবচেয়ে বেশি পরা হবে।’
হয়তো প্রতিবার ঘড়িটির দিকে তাকালে সময়ের সঙ্গে তিনি ফিরে যাবেন সেই ১৯৮৫-এর বিকেলে। ফিরে পাবেন নিজের সেই তরুণ বয়স, পাশে থাকা ছোট ভাইকে, আর একটি অপূর্ণ ইচ্ছেকে।
আর তখন হয়তো মনে হবে—কিছু ভালোবাসা সময়ের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী। কিছু উপহার হাতে পরা যায়, কিন্তু তার উষ্ণতা থেকে যায় হৃদয়ে।
সানা/আপ্র/৩০/৮/২০২৬