তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার মধ্যেই দেশে আবারও ভয়াবহ লোডশেডিং শুরু হয়েছে। শনিবার বিকেলে বিদ্যুতের ঘাটতি সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র শিল্পে ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেল ৫টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৪৬৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হয় ১২ হাজার ৯৫২ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫১৭ মেগাওয়াটে। একই সময়ের তথ্য অন্য সংবাদমাধ্যমেও মিলে গেছে।
এর আগে বিকেল ৪টায় ১৬ হাজার ৪৪২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৩৫ মেগাওয়াট। তখন ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৪০৭ মেগাওয়াট। বিকেল ৩টায় ঘাটতি আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬১২ মেগাওয়াটে।
তবে সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ঘাটতি কমে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের ঘরে নেমে আসে। সন্ধ্যা ৬টায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ২৭ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা ৭টায় ছিল ৩ হাজার ১০ মেগাওয়াট।
কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি
লোডশেডিংয়ের সাম্প্রতিক চিত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর আগের দিন একই সময়ে, অর্থাৎ বিকেল ৫টায় লোডশেডিং ছিল ৯২৩ মেগাওয়াট। তার আগের দিন বৃহস্পতিবার একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৭৭৮ মেগাওয়াট। তবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় লোডশেডিং ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল, যা গত কয়েক দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল।
ছুটির দিন শনিবারও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দফা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে। কোথাও এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পরই আবার চলে গেছে। আবার কোথাও নির্ধারিত সময়ের বাইরেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল।
তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন বাসাবাড়ির মানুষ। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক জায়গায় পানির পাম্প চালানো সম্ভব হয়নি। এতে কোথাও কোথাও খাবার পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, অনলাইনভিত্তিক কাজ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা ব্যাহত হচ্ছে। রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় প্রচণ্ড গরমের মধ্যে স্বাভাবিক ঘুম থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন মানুষ।
গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহে চাপ
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, তীব্র গরমে চাহিদা বাড়লেও বড় কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে।
একই সঙ্গে কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে বিকল্প উৎস থেকেও চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ব্যবধান দ্রুত কমানো না গেলে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে তাপমাত্রা ও বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়লে সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়বে।
এদিকে পেট্রোবাংলার শনিবার রাত ১০টার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২ হাজার ৪৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে এসেছে ৮৪১ মিলিয়ন ঘনফুট।
বিদ্যুতের চাহিদা যখন তীব্র গরমে দ্রুত বাড়ছে, তখন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান কমিয়ে আনা এখনই সম্ভব না হলে সামনের দিনগুলোতে লোডশেডিং আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সানা/আপ্র/৩০/৮/২০২৬