প্রবীণ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেনকে স্বাধীনতা পুরস্কার না দেওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তাঁর মতে, গণতন্ত্রের পাশাপাশি একটি ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠাও কামাল হোসেনের রাজনৈতিক বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
শনিবার (২৯ আগস্ট) ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে গণফোরামের ৩৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং দলটির প্রতিষ্ঠাতা কামাল হোসেনকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে রেহমান সোবহান এ আক্ষেপ প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে কামাল হোসেনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করার দাবিও উঠে আসে।
রেহমান সোবহান বলেন, ‘১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই ড. কামাল হোসেনের রাজনৈতিক জীবনের শুরু। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আইনজীবী হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন।’
কামাল হোসেনকে স্বাধীনতা পুরস্কার না দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে কথা হয়েছে, কামালকে স্বাধীনতা পদক দেওয়া উচিত ছিল কি না। বিগত সরকার সংবিধানের যে ড্রাফটসম্যান ছিলেন, অর্থাৎ যিনি হাতে লিখে সংবিধানের খসড়া তৈরি করেছিলেন, তাকে স্বাধীনতা পদক দিয়েছে। কিন্তু এই যে সংবিধানের মেইন অথর ছিলেন, তাকে কোনো পরিচয় দেওয়া হয়নি। দুর্ভাগ্যবশত এভাবেই দেশের ইতিহাস চলে।’
রেহমান সোবহানের ভাষায়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ন্যায্য সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষাও কামাল হোসেনের রাজনৈতিক বিশ্বাসের অংশ ছিল।
সংবিধান প্রণয়ন থেকে গণফোরাম
৮৮ বছর বয়সী কামাল হোসেন বাংলাদেশের রাজনীতি ও আইন অঙ্গনের অন্যতম পরিচিত ব্যক্তিত্ব। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী হিসেবে তিনি বিভিন্ন দেশের সরকারকে পেট্রোলিয়াম নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আইনি পরামর্শ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনি পরামর্শক ও সালিস হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কামাল হোসেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের আইনমন্ত্রী, পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে ১৯৯২ সালে তাঁর নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে গণফোরাম। দীর্ঘ পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনের ইতি টানার ঘোষণা দেন কামাল হোসেন ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর। পরের বছর দলের নতুন কমিটিতে তাঁকে এমিরেটাস সভাপতি করা হয়।
‘জনগণই ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়েছে’
অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্যে কামাল হোসেন বলেন, ‘সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ বলা হলেও বিগত সময়ে জনগণই ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত ও উপেক্ষিত হয়েছে।’
গণফোরাম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই দলটির লক্ষ্য। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
দেশে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সন্ত্রাস, সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানান কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধভাবে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে হবে। ভবিষ্যতে সরকার এই অশুভ শক্তিকে দমন করতে ব্যর্থ হলে দেশে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে।’
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী আব্দুল মঈন খান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের—বাসদের উপদেষ্টা খালেকুজ্জামান, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বক্তব্য দেন।
সানা/আপ্র/৩০/৮/২০২৬