বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা ‘পুনর্মিলন’ শব্দটি এখন নিছক রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক চরিত্র, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান আওয়ামী লীগের সঙ্গে পুনর্মিলনের সম্ভাবনাকে একেবারে নাকচ না করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পুনর্মিলনের মৌলিক শর্ত হলো সংঘটিত অপরাধের স্বীকৃতি ও অনুতাপ। একই সঙ্গে অপরাধের বিচার ও আইনি জবাবদিহি অব্যাহত থাকবে। এই অবস্থান নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কখনোই সুস্থ, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক ছিল না। ক্ষমতায় থাকা দল বিরোধীদের দমন করেছে, বিরোধীরা ক্ষমতায় গিয়ে একই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করেছে। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেনি, আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা ক্রমেই গভীর হয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল, এবার হয়তো সেই পুরোনো বৃত্ত ভাঙবে। কিন্তু বাস্তবতার অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, পরিবর্তনের বদলে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই নতুন রূপ ফিরে আসছে।
আওয়ামী লীগকে স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী বলা হয় মূলত তাদের দীর্ঘ শাসনামলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা, বিরোধী মত দমন এবং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগের কারণে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা যদি হয় শুধু একটি বড় রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে নতুন একচেটিয়া রাজনৈতিক বিন্যাস তৈরি করা, তাহলে পরিবর্তনের মৌলিক উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। যে কারণে একটি প্রশ্ন অনিবার্য: একই রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা যদি নতুন পোশাকে ফিরে আসে, তাহলে পরিবর্তনটি কোথায়?
সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়েও তাই আত্মতুষ্টির বদলে আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। বড় একটি রাজনৈতিক দল ও তার সমমনা শক্তিকে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার বাইরে রেখে কোনো নির্বাচনকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নির্বাচন দাবি করলেই সেটি শ্রেষ্ঠ হয়ে যায় না। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বহুমত ও জনগণের স্বাধীন পছন্দ। আওয়ামী লীগের সমর্থক এখনো দেশে কম নয়; বরং গত দুই বছরের নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতায় তাদের একটি অংশ নতুন করে ওই দলের প্রতি সহানুভূতিশীলও হয়ে থাকতে পারেন। বাস্তবতাকে অস্বীকার করে স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
অবশ্যই অপরাধের বিচার হতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ যেকোনো গুরুতর অপরাধের দায় ব্যক্তির ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আইনের আওতায় নির্ধারিত হওয়া জরুরি। অনুতাপ বিচার থেকে অব্যাহতির পাসপোর্ট হতে পারে না। কিন্তু বিচার আর রাজনৈতিক বর্জন এক বিষয় নয়। অপরাধীর বিচার হবে আদালতে; আর রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীদের অধিকার নির্ধারিত হবে সংবিধান ও আইনের ভিত্তিতে।
তৃতীয় কোনো পক্ষ যদি পুনর্মিলনের উদ্যোগ নেয়, সেটি তাই দুর্বলতা নয়; বরং সুস্থ রাজনীতির সূচনা হতে পারে। প্রশ্ন হলো, কে সেই তৃতীয় পক্ষ? রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, নাকি এমন কোনো সর্বজনগ্রাহ্য জাতীয় উদ্যোগ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে স্বচ্ছতার সঙ্গে। পুনর্মিলন হতে হবে সত্য স্বীকার, অনুতাপ, বিচার, জবাবদিহি ও ভবিষ্যতে একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি না করার অঙ্গীকারের ভিত্তিতে।
বাংলাদেশকে এগোতে হলে কোনো দলকে চিরস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ বা কোনো মতকে চিরস্থায়ীভাবে ক্ষমতার বাইরে রাখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সব অপরাধের বিচার হোক, কিন্তু সব রাজনৈতিক মতের মানুষের সাংবিধানিক অধিকারও নিশ্চিত হোক। আগামী নির্বাচনগুলোতে সব বৈধ রাজনৈতিক শক্তি অংশ নিক, জনগণ স্বাধীনভাবে পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নিক। তাহলেই প্রতিহিংসার রাজনীতি পেরিয়ে বাংলাদেশ সত্যিকারার্থে একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ও সুখকর রাজনৈতিক ধারার সন্ধান পাবে।
সানা/আপ্র/৮/১০/২০২৬