সূর্যের পৃষ্ঠের এ যাবৎকালের সবচেয়ে স্পষ্ট ও সূক্ষ্ম ছবি তুলেছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এসব ছবিতে সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠজুড়ে পালকের মতো অদ্ভুত নকশা, ঢেউ এবং চৌম্বকীয় প্লাজমার ঘূর্ণায়মান গতিবিধি ধরা পড়েছে। এর আগে এত সূক্ষ্মভাবে সূর্যের পৃষ্ঠের এ ধরনের অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা দেখা সম্ভব হয়নি।
ছবিগুলো তোলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের মাউই দ্বীপে অবস্থিত ড্যানিয়েল কে ইনোউয়ে সৌর দূরবীক্ষণযন্ত্রের মাধ্যমে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর দূরবীক্ষণযন্ত্র এবং সূর্যের পৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডলকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
গবেষকেরা জানান, সূর্যের পৃষ্ঠে প্রায় ৫০০ থেকে ২ হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত ঘূর্ণি ও তরঙ্গের মতো কাঠামো নতুন ছবিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। এত সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে যে মাত্রার স্পষ্টতা প্রয়োজন, নতুন দূরবীক্ষণযন্ত্রটি সেই সক্ষমতাই দেখিয়েছে।
ছবিগুলো দূরবীক্ষণযন্ত্রটির কার্যক্ষমতা পরীক্ষার সময় তোলা হয়েছিল। পরে সেগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা সূর্যের আলোকময় বহিরাবরণে এমন কিছু সূক্ষ্ম নকশা দেখতে পান, যা আগে এত পরিষ্কারভাবে ধরা পড়েনি।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে, সূর্যের পৃষ্ঠজুড়ে চৌম্বকীয় প্লাজমার ভিন্ন ভিন্ন প্রবাহ একে অপরের পাশ দিয়ে বিভিন্ন গতিতে চলাচল করছে। এসব প্রবাহের পারস্পরিক ঘর্ষণ ও অস্থিতিশীলতার ফলে সেখানে যে ঢেউ ও ঘূর্ণির সৃষ্টি হচ্ছে, নতুন ছবিতে তারই চমকপ্রদ চিত্র পাওয়া গেছে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞানীরা তরল বা গ্যাসের বিভিন্ন স্তর ভিন্ন গতিতে প্রবাহিত হলে সৃষ্ট অস্থিতিশীল তরঙ্গের সঙ্গে এর তুলনা করেছেন। পৃথিবী ও বৃহস্পতির মতো গ্রহের বায়ুমণ্ডলেও এ ধরনের তরঙ্গ ও ঘূর্ণির বিভিন্ন রূপ দেখা যায়। তবে সূর্যের পৃষ্ঠে এত সূক্ষ্ম ও স্পষ্টভাবে এ ধরনের কাঠামো আগে দেখা যায়নি।
নতুন পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌর-পদার্থবিদ রুইঝু চেন ছবিগুলোর দৃশ্যকে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ভ্যান গঘের ‘স্টারি নাইট’ ছবির আকাশে ঘূর্ণায়মান আলো ও রঙের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
গবেষণার সহলেখক ও জাতীয় সৌর মানমন্দিরের বিজ্ঞানী ফ্রিডরিখ ভেগারের ভাষ্য, সূর্যের পৃষ্ঠে এত স্পষ্ট ও সূক্ষ্মভাবে এ ধরনের ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি।
বিজ্ঞানীদের কাছে এসব পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব শুধু সূর্যের সৌন্দর্য দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সূর্যের পৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডলে চৌম্বকীয় ক্ষেত্র এবং প্লাজমার গতিবিধি কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা বোঝা সৌরক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে আরো নির্ভুল ধারণা পেতে সাহায্য করতে পারে।
বিশেষ করে বিজ্ঞানীদের অন্যতম লক্ষ্য হলো সূর্যের শক্তিশালী বিস্ফোরণ বা করোনাল ভর নির্গমন সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানা। এ ধরনের ঘটনায় বিপুল পরিমাণ চার্জযুক্ত কণা ও চৌম্বকীয় শক্তি মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। সেগুলো পৃথিবীর দিকে ধেয়ে এলে উপগ্রহ, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও নৌ-চলাচল ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। একই সঙ্গে সৃষ্টি হতে পারে মনোমুগ্ধকর মেরুপ্রভা।
তাই সূর্যের পৃষ্ঠে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র চৌম্বকীয় পরিবর্তন ও প্লাজমার গতিবিধি যত ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে, ভবিষ্যতে সৌরঝড়ের পূর্বাভাস ও এর সম্ভাব্য প্রভাব বোঝার সক্ষমতাও তত উন্নত হতে পারে। গবেষণাটি বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৮/৮/২০২৬