মানুষের সৃজনশীলতার অন্যতম বড় ক্ষেত্র গল্প লেখায় এবার নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক পাঠক মানুষের লেখা গল্পের চেয়ে এআইয়ের তৈরি গল্পকে বেশি আকর্ষণীয় ও মানসম্মত বলে মনে করেছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের পরিচালিত এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ‘জাজমেন্ট অ্যান্ড ডিসিশন মেকিং’ সাময়িকীতে। গবেষণায় দেখা হয়েছে, পাঠকরা মানুষের লেখা ও এআইয়ের তৈরি গল্পের মধ্যে পার্থক্য কতটা বুঝতে পারেন এবং কোন ধরনের গল্পকে বেশি পছন্দ করেন।
গবেষণায় এক হাজার ৬৮২ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। তাঁদের প্রত্যেককে ছয়টি ছোটগল্পের মধ্যে একটি পড়তে দেওয়া হয়। এর মধ্যে তিনটি গল্প লিখেছিলেন মানুষ এবং বাকি তিনটি তৈরি করেছিল ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি। এআইয়ের তৈরি গল্পগুলোর বিষয়বস্তু ছিল মানুষের লেখা গল্পের মতোই।
গবেষকরা পাঠকদের জানিয়ে দিয়েছিলেন কোন গল্প মানুষের লেখা এবং কোনটি এআইয়ের তৈরি। তবে দেওয়া তথ্যের সবটাই সঠিক ছিল না। গল্প পড়ার পর পাঠকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়-গল্পটি কতটা আকর্ষণীয়, পাঠে কতটা মগ্নতা তৈরি করেছে এবং সামগ্রিক মান কেমন।
ফলাফলে দেখা যায়, যেসব পাঠক এআইয়ের তৈরি গল্প পড়েছেন, তারা সেগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের লেখা গল্পের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ও উন্নতমানের বলে মূল্যায়ন করেছেন। আবার যেসব এআইয়ের লেখা গল্পকে ভুলভাবে মানুষের লেখা বলে জানানো হয়েছিল, সেগুলোও পাঠকদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি প্রশংসা পেয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক যুক্তরাষ্ট্রের ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডিনা স্কোলনিক ওয়াইসবার্গ বলেন, বর্তমান এআই ব্যবস্থা এমন ছোটগল্প তৈরি করতে সক্ষম, যা মানুষের লেখার তুলনায় কোনো অংশে কম নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা পাঠকের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হচ্ছে।
তবে তিনি মনে করেন না, এর অর্থ হলো লেখালেখির দায়িত্ব পুরোপুরি এআইয়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে এআইয়ের তৈরি বা মানুষ-এআইয়ের যৌথ প্রচেষ্টায় লেখা সাহিত্য আলাদা একটি ধারা হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে। তবে মানুষের নিজস্ব সৃজনশীলতা, অভিজ্ঞতা ও আত্মপ্রকাশের গুরুত্ব কখনো শেষ হবে না।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, এআই সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব থাকা পাঠকরা চ্যাটজিপিটির লেখা গল্পকে বেশি নম্বর দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রযুক্তি সম্পর্কে ব্যক্তিগত ধারণাও গল্প মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।
গবেষকরা পরে আরো দুটি পরীক্ষা চালান। এতে ৯০৫ জন প্রাপ্তবয়স্ককে একই বিষয়ের একটি মানব রচিত ও একটি এআই নির্মিত গল্প দেওয়া হয়। তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয় কোনটি মানুষের লেখা এবং কোনটি এআইয়ের তৈরি।
প্রথম পরীক্ষায় মাত্র ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী সঠিকভাবে পার্থক্য শনাক্ত করতে পারেন। দ্বিতীয় পরীক্ষায় এই হার ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ। গবেষকদের মতে, পাঠকরা সাধারণভাবে মানুষের লেখা ও এআইয়ের তৈরি গল্প আলাদা করার ক্ষেত্রে খুব বেশি সফল হননি।
তবে যাঁদের এআই প্রযুক্তি সম্পর্কে বেশি অভিজ্ঞতা ছিল, তাঁরা তুলনামূলক ভালোভাবে পার্থক্য বুঝতে পেরেছেন। অধ্যাপক ওয়াইসবার্গ বলেন, এআইয়ের লেখারও একটি নিজস্ব ধরন তৈরি হয়েছে, যা নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, মানুষ সাধারণত মানুষের লেখা গল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয় এর মৌলিকতা ও অকৃত্রিমতার কারণে। কিন্তু বাস্তবে অনেক পাঠক এআইয়ের লেখা গল্প পছন্দ করছেন, কারণ সেগুলো সহজবোধ্য ও দ্রুত গ্রহণযোগ্য।
তবে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম ও সৃজনশীল লেখালেখি বিভাগের অধ্যাপক লুক কেনার্ড এই গবেষণার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাঁর মতে, এআইকে শুধু সৃজনশীল সহযোগী হিসেবে দেখলে এর সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব উপেক্ষিত হতে পারে।
তিনি বলেন, এআই মানুষের তৈরি বিপুল তথ্যভান্ডারের ওপর নির্ভর করে কাজ করে এবং এর ব্যবহার নিয়ে নৈতিক ও পরিবেশগত প্রশ্ন রয়েছে।
গবেষণায় অংশ না নেওয়া কেনার্ডের মতে, এআই চমৎকার লেখা তৈরি করতে পারলেও তা মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও সৃষ্টিশীলতার বিকল্প হতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গল্প লেখায় এআইয়ের সক্ষমতা যতই বাড়ুক, ভবিষ্যতের সাহিত্য সম্ভবত মানুষ ও প্রযুক্তির যৌথ সৃজনশীলতার নতুন পথ তৈরি করবে।
সানা/আপ্র/৮/৮/২০২৬