দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ভয়াবহ মাত্রায় বেড়েছে। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে সারা দেশে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ হাজার ৭১২ জন এবং আহত হয়েছেন আরো ১৪ হাজার ১৪৩ জন। দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
শনিবার (৮ আগস্ট) রোড সেফটি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। সংগঠনটির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্বল আইন প্রয়োগ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো এবং সহজলভ্য গণপরিবহনের অভাব-সব মিলিয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৬ হাজার ৬৫টি দুর্ঘটনার মধ্যে ৩ হাজার ৫৪৮টি, অর্থাৎ ২২ দশমিক ০৮ শতাংশ ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষে। ৫ হাজার ৪৯৭টি বা ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। সবচেয়ে বেশি ৬ হাজার ৩১৪টি বা ৩৯ দশমিক ৩০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে ভারী যানবাহনের ধাক্কায়। অন্য ৭০৬টি বা ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে অন্যান্য কারণে।
দায়ী কারা: দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের হিসাবেও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী ৫ হাজার ৮৩১টি দুর্ঘটনার জন্য, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ৬ হাজার ৪৮১টি বা ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত পণ্যবাহী যানবাহন। বাসের কারণে ঘটেছে ২ হাজার ১৬৪টি বা ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ দুর্ঘটনা।
এ ছাড়া থ্রি-হুইলারের কারণে ৭৩২টি, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের কারণে ৪৩৮টি, পথচারীর কারণে ২৯৬টি এবং বাইসাইকেল ও রিকশার কারণে ১২৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে।
সড়কের ধরন অনুযায়ীও আঞ্চলিক সড়ক সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। মোট দুর্ঘটনার ৬ হাজার ৬৮৯টি বা ৪১ দশমিক ৬৩ শতাংশ ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে ৪ হাজার ৭৭৩টি বা ২৯ দশমিক ৭১ শতাংশ, শহরের সড়কে ২ হাজার ৬৪৬টি বা ১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং গ্রামীণ সড়কে ১ হাজার ৯৫৭টি বা ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ দুর্ঘটনা।
তরুণদের ঝুঁকি বেশি: রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, দেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের প্রায় ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। এর বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণেরা ব্যবহার করেন। তাদের মধ্যে দ্রুতগতিতে ও বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল চার চাকার যানবাহনের তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ উন্নত ও সহজলভ্য গণপরিবহনের ঘাটতি এবং তীব্র যানজটের কারণে অনেকেই মোটরসাইকেলকে দ্রুত ও সুবিধাজনক যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপস্থাপনাও তরুণদের মধ্যে অতিরিক্ত গতির প্রতি আকর্ষণ তৈরি করছে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।
সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পেছনে কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা, রাজনীতিতে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর সংস্কৃতি, আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সচেতনতামূলক কর্মসূচির ঘাটতি, দুর্বল সড়ক অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও নজরদারির অভাব, অসহনীয় যানজট এবং সাশ্রয়ী গণপরিবহনের সংকটকে দায়ী করেছে।
দুর্ঘটনা কমাতে সংগঠনটি মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার, মানসম্পন্ন হেলমেট বাধ্যতামূলক করা, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রচারণা জোরদারের সুপারিশ করেছে।
একই সঙ্গে মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনা, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাকে কেবল চালকের অসচেতনতার ফল হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান হবে না। চালকের আচরণ, যানবাহনের গতি, ভারী যানবাহনের চলাচল, সড়কের নকশা, আইন প্রয়োগ, গণপরিবহন এবং নজরদারি-সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নইলে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশকে সড়কে হারানোর এই উদ্বেগজনক প্রবণতা থামানো কঠিন হবে।
সানা/আপ্র/৮/৮/২০২৬