ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার জরিমানা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত। শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে দায়ী করে এই অর্থ জমা দিতে বলা হয়েছে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা তহবিলে।
একই সঙ্গে শিশু ও কিশোর ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বেশ কিছু পরিবর্তন আনার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
নিউ মেক্সিকোর সান্তা ফের প্রথম বিচারিক জেলার আদালতের বিচারক ব্রায়ান বিডশাইড বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) এ রায় দেন। রাজ্যের ডেমোক্র্যাট দলীয় অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেসের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া রায়ে বিচারক বলেন, মেটার কার্যক্রম নিউ মেক্সিকোতে জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
মামলায় রাউল তোরেস অভিযোগ করেন, মেটা ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নকশা করেছে, যাতে শিশু-কিশোররা এসব প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত সময় কাটাতে ও আসক্ত হয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি শিশুদের যৌন হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে প্রতিষ্ঠানটি ব্যর্থ হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
এর আগে চলতি বছরের মার্চে একই মামলার প্রথম ধাপে একটি জুরি বোর্ড রায় দেয়, তরুণ ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে মেটা ভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করেছে। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটিকে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
সর্বশেষ রায়ে বিচারক মেটাকে আগামী পাঁচ বছর শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে মাসিক সময়সীমা নির্ধারণ, অতিরিক্ত নোটিফিকেশন সীমিত করা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের যোগাযোগে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবটের জন্য নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি এবং শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আরো কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা।
এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টির বেশি অঙ্গরাজ্য এবং ১ হাজার ৩০০টির বেশি স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জনস্বার্থ ক্ষতির অভিযোগে মামলা করেছে। এসব মামলায় আর্থিক ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে পরিবর্তন আনার দাবি জানানো হয়েছে।
মেটা জানিয়েছে, তারা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে। এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, অনলাইনে কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে তারা আত্মবিশ্বাসী এবং অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে।
অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেস বলেন, মেটা শিশুদের নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এই রায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়, বরং অন্য অঙ্গরাজ্য ও দেশগুলোর জন্যও একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে।
গত বছর রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে উঠে আসে, মেটার অভ্যন্তরীণ নথিতে এমন তথ্য ছিল যে, তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট শিশুদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথোপকথনে যুক্ত হতে পারে।
সর্বশেষ রায়ে বিচারক নির্দেশ দিয়েছেন, নিউ মেক্সিকোর কোনো শিশু যেন মেটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবটের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আলোচনায় জড়াতে না পারে। একইভাবে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক যেন চ্যাটবট ব্যবহার করে শিশুদের ঘিরে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আগামী সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে মেটার বিরুদ্ধে আরেকটি বড় মামলার শুনানি শুরু হবে। সেখানে ২৯টি অঙ্গরাজ্য অভিযোগ করেছে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে শিশুরা আসক্ত হয়ে পড়ে এবং ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে।
এ ছাড়া টেনেসি অঙ্গরাজ্যের করা আরেকটি মামলার বিচারও চলছে। মেটা ইতিমধ্যে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে বাড়তে থাকা আইনি চাপ তাদের ব্যবসায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র: রয়টার্স
সানা/আপ্র/৮/৮/২০২৬