বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির অধ্যাপক সায়ীফ সালাহউদ্দিনের সহপ্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সোনেরা ম্যাগনেটিকসের নির্দিষ্ট কিছু সম্পদ অধিগ্রহণ করেছে অ্যাপল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিগ্রহণসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে এ অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়। তবে অ্যাপল বা সোনেরা কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এ লেনদেনের ঘোষণা দেয়নি।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, অ্যাপল একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সোনেরার নির্দিষ্ট কিছু সম্পদ অধিগ্রহণ করবে এবং প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মীকে চাকরির প্রস্তাব দেবে। তবে অধিগ্রহণের আর্থিক মূল্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে পুরো সোনেরা ম্যাগনেটিকস কোম্পানিই অ্যাপল কিনে নিয়েছে - এমন তথ্য প্রকাশ্য নথিতে নিশ্চিত নয়।
সোনেরা এমন এক ধরনের অ-আক্রমণাত্মক সেন্সর প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যা মস্তিষ্ক, স্নায়ু ও পেশির কার্যকলাপ থেকে তৈরি দুর্বল চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করতে পারে। প্রচলিত বৈদ্যুতিক সংকেতভিত্তিক পদ্ধতির তুলনায় এ প্রযুক্তির অন্যতম সম্ভাবনা হলো, শরীরে কোনো যন্ত্র স্থাপন বা ত্বকে সরাসরি সংযোগ ছাড়াই জৈবিক সংকেত শনাক্ত করা।
প্রতিষ্ঠানটির প্রথম পণ্য ছিল পেশির কার্যকলাপ শনাক্তের জন্য তৈরি এস১ চিপ। সোনেরার দাবি, একই প্রযুক্তি মস্তিষ্কের চৌম্বকীয় কার্যকলাপ শনাক্ত করতে পারে। কৃত্রিম অঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, স্নায়ু-পেশির বিভিন্ন অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতের পরিধানযোগ্য প্রযুক্তিতেও এ ধরনের সেন্সর ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
বার্কলি থেকে সোনেরা: সোনেরা ম্যাগনেটিকস ২০১৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলিতে শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় নিশিতা ডেকা ও ডমিনিক লাবানোভস্কির উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে। পরে বার্কলির অধ্যাপক সায়ীফ সালাহউদ্দিন প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম সহপ্রতিষ্ঠাতা হন। লাবানোভস্কির পিএইচডি গবেষণার তত্ত্বাবধায়কও ছিলেন তিনি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক নাম ছিল সোনেরা ম্যাগনেটিকস। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ্যে আসে এবং সে সময় ১ কোটি ১০ লাখ ডলার অর্থায়ন পাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়। তাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল মস্তিষ্ক ও শরীরের জৈবিক কার্যকলাপ শনাক্তের প্রযুক্তিকে তুলনামূলকভাবে ছোট, বহনযোগ্য ও সাশ্রয়ী করা।
সোনেরার সহপ্রতিষ্ঠাতা নিশিতা ডেকা ২০২০ সালে জানিয়েছিলেন, তাঁদের লক্ষ্য ছিল কম খরচে ও দ্রুততর পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ শনাক্ত করা, যাতে প্রযুক্তিটির কার্যক্ষমতাও উচ্চমানের থাকে। তিনি এটিকে কার্যকরী ইমেজিং হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যেখানে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ সরাসরি শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
বাংলাদেশি গবেষক সায়ীফ সালাহউদ্দিন: সায়ীফ সালাহউদ্দিন ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ ও কম্পিউটার প্রকৌশলে পিএইচডি করেন। ২০০৮ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির তড়িৎ প্রকৌশল ও কম্পিউটারবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি সেখানে তড়িৎ প্রকৌশল ও কম্পিউটারবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন।
চৌম্বকীয় সেন্সর, বৈদ্যুতিক যন্ত্র, উপকরণ, অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি ও শক্তি-সাশ্রয়ী কম্পিউটিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর গবেষণা রয়েছে। তাঁর গবেষণার সঙ্গে সোনেরার সেন্সর প্রযুক্তিরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
২০১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রারম্ভিক কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্মান ‘প্রেসিডেনশিয়াল আর্লি ক্যারিয়ার অ্যাওয়ার্ড ফর সায়েন্টিস্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’ প্রদান করেন।
অ্যাপলের সম্ভাব্য ব্যবহার: সোনেরার প্রযুক্তি ভবিষ্যতে অ্যাপলের স্বাস্থ্য ও পরিধানযোগ্য প্রযুক্তিতে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রযুক্তি বিশ্লেষণে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে স্নায়ু ও পেশির কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ, নির্দিষ্ট স্নায়ু-পেশিজনিত অবস্থার ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ এবং কৃত্রিম অঙ্গ নিয়ন্ত্রণের মতো কাজে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
চিন্তার মাধ্যমে যন্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে অ্যাপলের ভিশন প্রো ব্যবহার করে চিন্তার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছিল, যদিও সেই পরীক্ষায় ব্যবহারকারীর মাথায় একটি যন্ত্র স্থাপন করতে হয়েছিল। সোনেরার প্রযুক্তি শরীরে কোনো যন্ত্র স্থাপন ছাড়াই মস্তিষ্কের চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্তের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, মাথার খুলির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বৈদ্যুতিক সংকেত দুর্বল হয়ে যায়। সোনেরার প্রযুক্তি বৈদ্যুতিক সংকেতের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করার ওপর নির্ভর করে। ফলে ভবিষ্যতে আরো ছোট ও বহনযোগ্য স্নায়ু-সংবেদন প্রযুক্তি তৈরিতে এর ব্যবহার হতে পারে।
তবে অ্যাপল এখন পর্যন্ত সোনেরার প্রযুক্তি কোন পণ্য বা সেবায় ব্যবহার করবে, তা ঘোষণা করেনি। ফলে ভবিষ্যতের অ্যাপল ওয়াচ বা অন্য কোনো যন্ত্রে এ প্রযুক্তি যুক্ত হবে কি না, সেটি এখনো সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়েছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৬/৯/২০২৬